সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ঋণ করে লেবাননে গিয়েছিলেন সাতক্ষীরার দুই প্রবাসী শফিকুল ইসলাম (৪৫) ও নাহিদুল ইসলাম (২১)। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, বিদেশে গিয়ে উপার্জন করে ভাগ্যবদল করবেন। কাজ করতেন একটি ফলের বাগানে। কিন্তু প্রায় এক মাস আগে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় তাঁরা নিহত হন। চার সপ্তাহের অপেক্ষার পর আজ রোববার তাঁদের মরদেহ বাড়িতে এসেছে।
গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে তাঁদের মরদেহ রাজধানীর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। আজ সকাল সোয়া ১০টার দিকে ঢাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ সাতক্ষীরা সদর ও আশাশুনি উপজেলায় নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছায়। মরদেহ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে দুই গ্রামে নেমে আসে মাতম। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
গত ১১ মে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ জেলার জেবদিন এলাকায় রুটি বহনকারী একটি গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় ঘটনাস্থলেই শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম নিহত হন। শফিকুল সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা-চাঁদপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং নাহিদুল আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের বাসিন্দা আবদুল কাদেরের ছেলে। তাঁরা দুজনই ঋণ দেনা করে চলতি বছরের রোজার শুরুতে লেবাননে গিয়েছিলেন।
সদর উপজেলার ভালুকা-চাঁদপুর গ্রামে শফিকুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনায় আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভিড় করেছেন। স্বামীর মরদেহ দেখে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন স্ত্রী রুমা খাতুন। দুই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছিলেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুমা খাতুন বলেন, ‘সংসারের হাল ধরতে বিদেশে গিয়েছিল আমার স্বামী। ঋণ করে পাঠিয়েছি। এখন এই ঋণ শোধ করব কীভাবে? দুই মেয়েকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব?’
স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর চার সপ্তাহ ধরে মরদেহ ফেরানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কেটেছে রুমা খাতুনের। এখন সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। রুমা বলেন, ‘সচ্ছলতা আনতে গিয়েছিল, ফিরল লাশ হয়ে। মেয়েদের লেখাপড়া কীভাবে চালাব, জানি না।’
শফিকুলের মা আজেয়া খাতুন ছেলের নাম ধরে বিলাপ করছিলেন। পাশেই নির্বাক বসে ছিলেন বাবা আফসার আলী। চোখেমুখে অসহায়ত্বের ছাপ। আফসার আলী বলেন, ‘ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে গরু বিক্রি করেছি, এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি, আত্মীয়দের কাছ থেকেও টাকা ধার করেছি। ভেবেছিলাম, ছেলে উপার্জন করে সংসারের কষ্ট দূর করবে। এখন সেই লাশ হয়ে ফিরল।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শফিকুল পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, শফিকুলের পরিবার অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় আছে। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষকে তাঁদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামে নাহিদুলের বাড়িতে একই ধরনের শোকাবহ পরিবেশ। নাহিদুলের বাবা আবদুল কাদের ও মা নুরুন্নাহার খাতুন ছেলের মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মা নুরুন্নাহার বিলাপ করছিলেন আর বলছিলেন, ‘আমরা এখন কাকে নিয়ে বাঁচব, কীভাবে বাঁচব?’
কাদাকাটি ইউপির চেয়ারম্যান দীপঙ্কর সরকার বলেন, নাহিদুলের পরিবার ঋণের বোঝায় জর্জরিত। সরকারি সহায়তা না পেলে তাঁরা বড় সংকটে পড়বে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, শনিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে লেবানন থেকে মরদেহ দুটি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। পরে সেগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মরদেহ পরিবহন ও দাফনের জন্য সরকারিভাবে ৩৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।