‘ভোট দিই বা না দিই, আমাগের জীবন তো একই থাকে’

নৌকা–জাল নিয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে নির্বাচন নিয়ে আলাপ করছেন কয়রা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা। গতকাল রোববার কয়রার শাকবাড়িয়া নদীর তীরেছবি: প্রথম আলো

শীতের কুয়াশায় মোড়া ভোর। ধীরে ধীরে জেগে উঠছে খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর তীর। সোমবার পূর্ব আকাশে আলোর রেখা ফুটতেই নৌকার আনাগোনায় নদীতীর মুখর হয়ে ওঠে। কেউ জাল গোছাচ্ছেন, কেউ ধরছেন বইঠা। সবার গন্তব্য একটাই—সুন্দরবন। এই চিরচেনা ব্যস্ততার মধ্যেই বনজীবীদের আলোচনায় ঢুকে পড়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

নৌকার পাশে দাঁড়িয়ে জাল গোছাচ্ছিলেন বনজীবী জেলে আমিরুল ইসলাম। ভোটের কথা তুলতেই হালকা হাসি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা হুলো গরিব মানুষ। গরিবের চিন্তা একটাই—আজ কী খাব, কাল কীভাবে চলব। ভোট তো বহুবার দিছি। বুইঝে গেছি, এই ভোট গরিবের জন্যি না। ভোট হইলো রাজনীতির বড়লোকগের খেলা। ভোট দিই বা না দিই, আমাগের জীবন তো একই থাকে।’

কিছুক্ষণ চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে আমিরুল আবার বলেন, ‘ভোটে যে–ই জিতুক, আমাগের তো বনে যাইতেই হবে। বাদাবনের কাজ না করলি সংসার চলে না। আগে সুন্দরবনে ডাকাত ছিল না, এখন আবার চাঁদা দিতি হয়। গরিব মানষির কথা কেউ ভাবে না।’

শাকবাড়িয়া নদীর তীরের বেড়িবাঁধে বসে মাছ ধরার জাল মেরামত করছিলেন ৪ নম্বর কয়রা গ্রামের দিদারুল মোল্লা। তিনি বলেন, ‘এইবার ভোটটা দিতি চাই। আগের কয়ডা নির্বাচনে ভোট দিতি পারিনি। কিন্তু শুনতিছি, ভোটের দিন নাকি গণভোটও হবে। এই রাজার ভোটের মধ্যি আবার গণভোট ঢুকল কেমনি!’

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বনজীবী কোহিনুর আলম সদ্য সুন্দরবন থেকে মাছ ধরে ফিরেছেন। তাঁর কথায়, ‘আগে তো ভোটই দিতি পারতাম না। এবার নাকি দুইখান ব্যালট দেবে। একখান রাজার ভোটের, আরেকখান গণভোটের। কে জিতল বড় কথা নয়—ভোটটা যেন ঠিকমতো হয়, সেইডাই চাই।’

আরও পড়ুন

শাকবাড়িয়া নদীর তীর ধরে এগোলে একের পর এক চোখে পড়ে কয়রা উপজেলার টেপাখালী, গুড়িয়াবাড়ী, পাথরখালী, হরিহরপুর, গাতিরঘেরি, বীণাপাণি, জোড়শিং ও গোলখালী গ্রামের চিরচেনা দৃশ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব এলাকার মানুষ সুন্দরবন ও নদীর ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন।

সরেজমিনে এসব এলাকা ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়রা উপজেলার প্রধান সমস্যাগুলো ভাঙাচোরা সড়ক, দুর্বল বেড়িবাঁধ আর সুপেয় পানির সংকট। এই তিন সমস্যাই নিত্যদিনের কষ্টকে আরও গভীর করে তুলেছে।

গুড়িয়াবাড়ী গ্রামের স্কুলশিক্ষক অরবিন্দ মণ্ডল বলেন, আইলা, বুলবুল, আম্পান ও ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড়ে কয়রা উপজেলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্যোগের ক্ষতচিহ্ন এখনো রয়ে গেছে। লবণাক্ততার কারণে অনেক জমি একফসলি হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থান কমে গেছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা রাস্তা ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, কিন্তু ভোটের পর সেগুলোর বাস্তবায়নই বড় প্রশ্ন।

সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা–৬ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৮ হাজার ৭৩৪ জন। এই ভোটারের বড় অংশই সুন্দরবননির্ভর শ্রমজীবী মানুষ।

জোড়শিং গ্রামের বেড়িবাঁধে বসে জাল মেরামত করছিলেন বৃদ্ধ জেলে আশরাফ মোল্লা। সুচের ফোঁড়ের ফাঁকে ফাঁকে তিনি বললেন, ‘সামনের মাসের ১২ তারিখ ভোট জানি। তয় কাজের মধ্যি থাকি, বেশি খোঁজখবর রাখিনে। মনের মধ্যি একটা মার্কা ঠিক করা আছে। তবে শেষ পর্যন্ত যে আগাই থাকবে, তারেই ভোট দেব।’

সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা–৬ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৮ হাজার ৭৩৪ জন। এই ভোটারের বড় অংশই সুন্দরবননির্ভর শ্রমজীবী মানুষ। আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পি (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর আবুল কালাম আজাদ (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আসাদুল্লাহ ফকির (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রশান্ত কুমার মণ্ডল (কাস্তে)।

উপকূলের মানুষের চাওয়া খুব সহজ। ভোটের দিন মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, আর যাঁরা ক্ষমতায় যাবেন, তাঁরা যেন সাধারণ মানুষের কথা ভুলে না যান
বিদেশ রঞ্জন মৃধা, কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি

গত বৃহস্পতিবার থেকে প্রার্থীরা এলাকায় গণসংযোগ ও প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। মাইকিং, পথসভা ও প্রচারপত্র বিতরণের মাধ্যমে ভোট চাইছেন। তাঁদের প্রতিশ্রুতির তালিকায় রয়েছে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির সংকট সমাধান, চিকিৎসাসেবার উন্নতি ও সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন বিকাশ। তবে এসব আশ্বাস ভোটের পর কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে ভোটারদের সংশয় কাটেনি।

গত দুই দিনে সুন্দরবনসংলগ্ন দুই উপজেলার ৩০ থেকে ৩৫ জন মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে। অনেকেই নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন, সেটি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। কেউ বলেন, ভোটে কিছু বদলায় না। তবু সবার কণ্ঠে একটাই প্রত্যাশা—ভোট যেন শান্তিপূর্ণ ও ভয়হীন হয়।

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, উপকূলের মানুষের চাওয়া খুব সহজ। ভোটের দিন মানুষ যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, আর যাঁরা ক্ষমতায় যাবেন, তাঁরা যেন সাধারণ মানুষের কথা ভুলে না যান—এইটাই তাঁদের একমাত্র প্রত্যাশা।