পাশাপাশি চার কবরে শায়িত একই পরিবারের চারজন

বাবা নাহিদুর রহমান ও মা আফসানা মতিন তানজির সঙ্গে দুই মেয়ে ইনায়া ও ইহানা। কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে মারা যান একই পরিবারের এই চারজনছবি: সংগৃহীত

পাশাপাশি খোঁড়া হয় চারটি কবর। দুটি বড়, দুটি ছোট। জানাজা শেষে মরদেহগুলো দাফন হয় পাশাপাশি এই চার কবরে।

কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে মারা যান যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের একই পরিবারের এই চারজন। ১১ দিন পর গতকাল বুধবার ভোরে তাঁদের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়।

আরও পড়ুন

নিহত ব্যক্তিরা হলেন নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৬) ও সুনাইনা ইহানা (৩)। উপজেলার বাঁধাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে গতকাল বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তাঁদের মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, পূজার ছুটি পেয়ে ১৫ অক্টোবর ঢাকা থেকে কক্সবাজার ঘুরতে যান নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ে। ১৬ অক্টোবর তাঁরা টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। ১৮ অক্টোবর দুপুরে তাঁদের চেকআউট করার কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই ১৭ অক্টোবর ভোরে রিসোর্টটিতে ভয়াবহ আগুন লাগে। এতে এই ৪ জনসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়।

পাশাপাশি চারটি কবরে দাফন করা হয়েছে নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের মরদেহ। বুধবার যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষার কারণে মরদেহ শনাক্ত করতে সময় লাগে। গত সোমবার বিকেলে কক্সবাজার পুলিশ ডিএনএ প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে। এরপর গত মঙ্গলবার দুপুরে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গতকাল ভোরে মরদেহগুলো গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

নাহিদুর রহমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগে চাকরি করতেন। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ঢাকার মিরপুরে থাকতেন তিনি। মনিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামে ‘ফারজানা ম্যানশন’ নামে দোতলা বাড়িতে নাহিদুরের বাবা মতিয়ার রহমান একাই থাকেন।

আরও পড়ুন

গতকাল দুপুরে মোহনপুরের ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্বজন ও এলাকাবাসীর ভিড়। বাড়ির বারান্দার এক পাশে একটি চেয়ারে বসে আছেন মতিয়ার রহমান। তাঁকে ঘিরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন স্বজনেরা। ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনির মৃত্যুশোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন তিনি।

আগুনে পোড়ার আগের রাতে নাহিদের সঙ্গে শেষ কথা হয় জানিয়ে তাঁর বাবা মতিয়ার রহমান বলেন, ‘তখন সে আমাকে বলে, “বাবা, তুমি চিন্তা কোরো না। তোমার নাতনিরা সি-বিচে আছে, বাচ্চারা খেলছে। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরব। বুধবার তুমি ঢাকার বাসায় চলে যেয়ো।” ওই শেষ কথা, আর কথা হবে না।’

বাড়িতে মরদেহ পৌঁছালে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দারা
ছবি: প্রথম আলো

কথার এক পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মতিয়ার। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছুটিতে গ্রামে এলে নাতনিরা মাতিয়ে রাখত বাড়ি। কত খেলা করতাম। আর কিছু হবে না। ফুলের মতো মাছুম বাচ্চারাও পুড়ে মারা গেছে।’

নাহিদুরের ফুফা আবদুল লতিফ রিসোর্টের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের তো একটা পরিবার শেষ হয়ে গেল!’

আরও পড়ুন