অবৈধপথে ইতালি যাত্রা, ১০ মাস ধরে সাগরের সন্ধান পাচ্ছে না পরিবার
অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার পথে লিবিয়া থেকে নিখোঁজ হয়েছেন মাদারীপুরের তরুণ সাগর মিয়া (২০)। ১০ মাস ধরে তাঁর কোনো খোঁজ পাচ্ছে না পরিবার। এর আগে লিবিয়ার এক বন্দিশালা থেকে তাঁর মুক্তির জন্য নেওয়া হয় ৯ লাখ টাকা। নিখোঁজ তরুণের সন্ধান চেয়ে এবং দালালের বিচার দাবি করেছেন তাঁর স্বজনেরা।
নিখোঁজ সাগর মাদারীপুর সদর উপজেলার খোঁয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা এলাকার কৃষক খবির মোল্লার ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সাগর বড়। তিনি গত বছরের ১৩ নভেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁর সন্ধান চেয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন তাঁর মা বেলাতুননেছা। একই সঙ্গে দালালের বিচার ও ছেলের সন্ধান চেয়ে মাদারীপুর আদালতে মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পাঁচজনকে আসামি করে সাগরের মা বেলাতুননেছা একটি মামলা করেছেন।
লিখিত আবেদন ও মামলার আরজি সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর শহরের সৈদারবালী এলাকার মানব পাচার চক্রের সদস্য ও স্থানীয় দালাল নামজুল ব্যাপারীর প্রলোভনে পড়ে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সাগর। ২৩ লাখ টাকায় সাগরকে সরাসরি ইতালি পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি করে দালাল চক্রটি। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর তিন ভাগের এক ভাগ টাকা পরিশোধ করে সাগরের পরিবার। টাকা নেওয়ার এক দিন পর ৩ নভেম্বর সাগরকে আকাশপথে সৌদি আরব নেওয়া হয়। সেখানে দুই দিন রেখে মিসর হয়ে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়া। বাংলাদেশি দালাল চক্র তাঁকে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় নিয়ে যায়। পরে সাগরকে লিবিয়া হয়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলে পরিবার থেকে চুক্তির ২৩ লাখ টাকা আদায় করা হয়। ১৫ নভেম্বর রাতে সাগরকে লিবিয়ার উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পাঠানোর উদ্দেশ্যে একটি নৌকায় তুলে দেওয়া হয়।
নৌকাটি কিছু দূর যাওয়ার পথে লিবিয়ার সন্ত্রাসীদের হাতে আটক হয়েছে বলে সাগরের পরিবারকে জানায় দালাল চক্রটি। আটক অভিবাসনপ্রত্যাশী সাগরের মুক্তির জন্য ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না পাওয়ার সাগরের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। পরে বাংলাদেশি আরেক দালাল গোলাম মওলার (৪৮) মাধ্যমে সাগরের মুক্তির জন্য ৯ লাখ টাকা দেয় তার পরিবার। টাকা নেওয়ার পর থেকে সাগরের কোনো সন্ধান দিতে পারছে না দালাল চক্রটি।
সাগরের সন্ধান চেয়ে দালালদের কাছে বারবার ধরনা দেওয়া হলেও তারা আশ্বাস ছাড়া কোনো খোঁজ গত ১০ মাসে দিতে পারেনি। তাই বাধ্য হয়ে সাগরের মা বেলাতুননেছা প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সন্তানের সন্ধান চেয়ে লিখিত আবেদন করেন। একই সঙ্গে গত ৪ জানুয়ারি দালালের বিচার ও ছেলের সন্ধান চেয়ে মাদারীপুর আদালতের মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলাও করেছেন তিনি।
নিখোঁজ সন্তানের সন্ধান চেয়ে মা বেলাতুননেছা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাঁইচা থাকলে ছেলে তো যোগাযোগ করত। ছেলেকে ফিরাইয়া দেওয়ার কথা কইয়া দালালে ধাপে ধাপে ৩২ লাখ টাকা নিছে। দালাল খালি আশা দিচ্ছে। তারা (দালাল) এখনো কয় না আমার ছেলে নাই? আমার ছেলে আর নাই, এটা বুঝতে পারতাছি। আমার বাঁচতে কষ্ট হচ্ছে। জমিজমা সব শেষ, ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে পড়েছি।’
দালালের বিরুদ্ধে মামলা করে উল্টো হয়রানি ও হুমকির মধ্যে পড়েছেন বলেও দাবি করেছেন বেলাতুননেছা। তিনি আরও বলেন, ‘মামলা দিয়েছি, চালাতে পারতাছি না। মামলা তুলে নিতে দাদালরা হুমকি দিচ্ছে। আমি বিচার চাই, ছেলেকে ফেরত চাই। আমার ছেলেরে ওরা কী করেছে, সেটা জানতে চাই। আমার সোনার টুকরা বাবার সন্ধান চাই। ওই আমার ভরসা।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় দালাল নামজুল ব্যাপারী হলেও তিনি মূলত কাজ করেন শিবচর উপজেলার মির্জারচর সিপাইকান্দি এলাকার ইসমাইল ব্যাপারীর ছেলে গোলাম মওলার হয়ে। গোলাম মওলা মানব পাচার চক্রের অন্যতম একজন সক্রিয় সদস্য। তাঁর অধীনে শিবচরসহ পুরো জেলায় অন্তত ১০ জন সহকারী রয়েছেন। এই সহকারীরা টাকা সংগ্রহ থেকে শুরু করে গ্রামের মানুষদের নানা প্রলোভন দিয়ে থাকেন। গোলাম মওলা ও তাঁর সহকারীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও চক্রের সদস্যরা সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সাগরের মা তাঁর সন্তানের সন্ধান চেয়ে যে মামলাটি আদালতে করেছেন, সেটি সদর থানার পুলিশ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেবে।আবুল কালাম আজাদ, মাদারীপুর সদর মডেল থানার ওসি
এ সম্পর্কে জানতে গোলাম মওলার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। তবে নামজুল ব্যাপারী নিজেকে নিরপরাধ দাবি করে বলেন, ‘আমি কোনো দালালি করি না। এগুলো আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ।’
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাগরের মা তাঁর সন্তানের সন্ধান চেয়ে যে মামলাটি আদালতে করেছেন, সেটি সদর থানার পুলিশ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেবে। এ ঘটনায় এক আসামিকেও ধরা হয়েছিল। বাকি আসামিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’