২০ বছর হয় পূর্বপুরুষের সে কাজ থেকে সরে এসেছেন মনসুর। কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য মিশতে শুরু হলে নদের পানি দূষিত হয়ে পড়ে। মাছ কমে যায় নদে। বাধ্য হয়েই আদি পেশা ছাড়তে হয় মনসুরদের। অন্য কোনো কাজ জানা না থাকায় নিজেদের তৈরি বানা বিক্রি শুরু করেন মাছ খামারিদের কাছে। সে থেকেই তিনি বানার ব্যাপারী হিসেবে পরিচিত।

সারা দেশেই চাহিদা আছে মনসুরের তৈরি বানার। তাঁর সঙ্গে থাকা জেলেরা এখন বানা তৈরির কারিগর। চট্টগ্রাম থেকে বাঁশ আসে। ১০ হাজার টাকায় কেনা প্রতি ১০০ বাঁশে ১৪ থেকে ১৬টি মাঝারি আকারের বানা তৈরি হয়। ময়মনসিংহ, যশোর, কুমিল্লা, রংপুরসহ সারা দেশেই বিক্রি হয় মনসুরের বানা। মান ও আকারভেদে প্রতি বর্গফুটের দাম পড়ে ১২০ থেকে ১৮০ টাকা। খরচ বাদে মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা মুনাফা গোনেন।

তবে নিজের নতুন পরিচয় নিয়ে খুব একটা খুশি নন বৃদ্ধ মনসুর। তিনি মনে করেন, কারখানার মালিকেরা নদ-নদী নষ্ট করায় গত ২০ বছরে তিনি অর্থনৈতিক ও মানসিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে দুই ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে হয়েছে। তা না হলে শেষ জীবনে পুরো পরিবার নিয়ে একসঙ্গেই সুখে থাকতে পারতেন।

তবে মনসুরের এমন কথায় আপত্তি আছে কারিগর আমজাদ হোসেনের। তাঁর মতে, ছেলেদের বিদেশ পাঠানোয় সংসারে আয় বেড়েছে, দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে। ডাইং কারখানা হওয়ায় হাজার হাজার মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশেরও উন্নয়ন হচ্ছে।

বৃদ্ধ মনসুরকে উদ্দেশ্য করে নিজের আপত্তির কথা জানান আমজাদ। তাতেই কিছুটা খেপে ওঠেন মনসুর। জোর গলায় প্রশ্ন করেন, ‘তিন পুরুষের পরিচয় হারাইলাম, নদী হারাইলাম, পোলাগো দূরে পাঠাইলাম, নিজে দিন-রাত খাইটা মরি। তারপরেও বাজারে গেলে পকেটের হিসাব পাই না কেন? আর কারখানায় হাজার মানুষের না লাখ মানুষের কাম অইল, হেইডা দেইখা আমার কী লাভ? আমি দেখি নদী নষ্ট অইছে, পানি নষ্ট অইছে। দশ জন আমরা কাম হারাইছি। দিন দিন অভাব বাড়ে কেন?’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন