জয়পুরহাটের কালাই
খননযন্ত্রে খাল খনন, তালিকায় দেখানো হলো ১৮০ শ্রমিক
সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, এ ধরনের প্রকল্পের অন্তত ৫০ শতাংশ কাজ স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
জয়পুরহাটের কালাইয়ের কানমনা-হারাবতী খাল পুনঃখনন প্রকল্পে বাস্তবে একজন শ্রমিকও কাজ করেননি। পুরো খননকাজ হয়েছে ছয়টি এক্সাভেটর (খননযন্ত্র) দিয়ে। অথচ বিল উত্তোলনের জন্য ১৮০ জন শ্রমিকের তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রকল্পের ৫৫ শতাংশ বিলও পরিশোধ করা হয়েছে।
সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, এ ধরনের প্রকল্পের অন্তত ৫০ শতাংশ কাজ স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে কালাইয়ের ১ কোটি ৮২ লাখ টাকার ওই প্রকল্পে সেই শর্ত মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নকশা অনুযায়ী খননকাজ না করা এবং খালের দুই পাড়ের মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রিরও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ‘টেকসই ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’–এর আওতায় কানমনা-হারাবতী খাল পুনঃখননের কাজ বাস্তবায়ন করছে কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেড।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমিতির এক সদস্য সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পে শ্রমিক দিয়ে কোনো কাজ না করলেও ১৮০ জনের একটি তালিকা তৈরি করে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল কাগজে-কলমে শ্রমিক দেখিয়ে বিল উত্তোলনের কাজ সম্পন্ন করা। কারণ শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়নি, এটা এলজিইডি জানলে বিল পেতে সমস্যা হবে। এ কারণে শ্রমিকদের ওই ভুয়া তালিকা করে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, পানির নিচে থাকা অংশ খনন না করেই আগাছা ও কচুরিপানা পরিষ্কার করে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। দায়সারা কাজ করায় বর্ষা শুরু হতেই আবার খাল ভরাট হচ্ছে।
ওই শ্রমিক তালিকার একটি কপি এই প্রতিবেদকের কাছেও রয়েছে। এই তালিকায় থাকা অন্তত ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের নামে যে ওই তালিকা রয়েছে, তাঁরা তা জানেন না। এ ছাড়া তাঁরা ওই প্রকল্পের কোনো কাজও করেননি।
কালাই উপজেলা প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ বলেন, কাজ শেষ হওয়ার পর পোস্টওয়ার্ক মেজারমেন্টের মাধ্যমে পুরো প্রকল্প পরিমাপ করা হবে। যেখানে যতটুকু কাজ হয়েছে, সে অনুযায়ী বিল দেওয়া হবে। কম কাজ হলে বিলও কম দেওয়া হবে। শ্রমিকদের তালিকা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে, তাই সেটি উপজেলা কার্যালয়ে সংরক্ষিত নেই।
উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কানমনা-হারাবতী খালের রোয়াইর স্লুইসগেট থেকে বানদিঘি গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক কোটি ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একই খালের আরও ৫ দশমিক ৯০৫ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের জন্য ৭১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দুই ধাপের কাজই বাস্তবায়ন করেছে কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেড। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং স্থানীয় দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
সরকারি নীতিমালায় বলা আছে, এ ধরনের পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে অন্তত ৫০ শতাংশ কাজ স্থানীয় হতদরিদ্র শ্রমিক দিয়ে করতে হবে। এতে একদিকে যেমন খালের উন্নয়ন হবে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রকল্পে সেই বিধান পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। শ্রমিকদের কাজ থেকে বঞ্চিত করে খননযন্ত্র দিয়ে পুরো খননকাজ করা হয়েছে।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, পানির নিচে থাকা অংশ খনন না করেই আগাছা ও কচুরিপানা পরিষ্কার করে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। সরকারি অনুমোদন বা দরপত্র ছাড়াই খালের দুই পাড়ের কিছু মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রিও করা হয়েছে। দায়সারা কাজ করায় বর্ষা শুরু হতেই আবার খাল ভরাট হচ্ছে। পুরো প্রকল্পের কাজ নতুন করে মেপে দেখা উচিত।
স্থানীয় মাত্রাই ইউনিয়নের মুন্নাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজের কাজ কিছুই হয়নি। খালের ভেতরের কিছু উঁচু জায়গার মাটি তুলে দেওয়া হয়েছে মাত্র। পুরো খাল সমানভাবে খনন করা হয়নি। বড় বড় গাছ কেটে নিয়ে গেছে। স্থানীয় লোকজন বাধা দিতে গেলে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মফিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, সরকারি নকশা ও নির্দেশনা অনুসারেই কাজ হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী খননযন্ত্র ও শ্রমিক—দুইভাবেই কাজ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ সঠিক নয়।
জানতে চাইলে তদারক কর্মকর্তা ও এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর বলেন, প্রকল্পের খননের কাজ ছয়টি খননযন্ত্র দিয়ে করা হয়েছে। তবে খালের দুই পাশের মাটি সমান করার কাজে কিছু শ্রমিক ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রকল্পে অন্তত ৫০ শতাংশ কাজ স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে করার বাধ্যবাধকতা বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।