স্থানীয় আওয়ামী লীগের অন্তত পাঁচজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ২০১৬ সালে দেবীদ্বার উপজেলার বরকামতা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আবুল কালাম আজাদের বাবা মো. নুরুল ইসলাম চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন। এতে তৎকালীন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল বিরোধিতা করেন। রাজীর বিরোধিতার পরও নুরুল ইসলাম জয়ী হন। ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনে আবুল কালাম আজাদ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। ওই নির্বাচনে বর্তমানে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল তাঁর আপন চাচা এ এফ এম তারেক মুন্সীকে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী করান। তারেক মুন্সী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান পদে প্রায় ৬০ হাজার ভোট পান। নির্বাচনে রাজীর অনুসারী আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মীরা ধানের শীষের পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করেন। এরপরও আজাদ চেয়ারম্যান পদে জয়ী হন। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দেবীদ্বারের ১৫টি ইউনিয়নের বেশির ভাগে নৌকার প্রার্থী হেরেছেন। এ নিয়ে সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যান একে অন্যকে দোষারোপ করেন।

এদিকে ২ জুলাই সন্ধ্যায় দেবীদ্বার উপজেলার বরকামতা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয় নবীয়াবাদ এলাকার কুমিল্লা মডেল কলেজে। ওই সম্মেলনে কোনো কমিটি ঘোষণা না করে সংসদ সদস্য পরে কমিটির নাম ঘোষণা করা হবে বলে জানান। এরপর উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের অনুসারীরা কমিটি ঘোষণার দাবিতে রাত সাড়ে আটটা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সংসদ সদস্য রাজীর গাড়ি আটকে রাখেন। একই সঙ্গে বিক্ষাভ করেন। পরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এক নেতার নির্দেশে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রোশন আলী বরকামতা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন। এরপর সংসদ সদস্য রাজীর গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে রাজী ক্ষুব্ধ হন।

এদিকে ২১ জুলাই দেবীদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হবে। এ নিয়ে গতকাল ১৬ জুলাই বিকেলে সংসদ ভবনের এলডি হলে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সভা হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ম. রুহুল আমিন। সভায় উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রোশন আলী, একই কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, দেবীদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মনিরুজ্জামান, উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম সফিকুল আলম ওরফে ভিপি কামাল প্রমুখ।

সভায় দেবীদ্বারের এলাহাবাদ ইউনিয়ন কমিটি অনুমোদনের প্রস্তাব করেন এক নেতা। তখন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রোশন আলী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন। তখন রাজী এই কমিটি মানি না বলে আপত্তি জানান। তখন রাজীর পাশে বসা ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান আজাদ। তিনি দাঁড়িয়ে কমিটি সুন্দর হয়েছে, সম্মেলনে তাঁদের রাখার পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তখন পাশে বসা রাজী চেয়ার থেকে উঠে উপজেলা চেয়ারম্যানের মাথা, নাক, মুখে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে কিল–ঘুষি মারতে থাকেন। এ সময় সভায় উপস্থিত সদস্যরা রাজীকে নিবৃত্ত করেন।

অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের মুঠোফোনে আজ রোববার দুপুরে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এর আগে ঘটনার পর গতকাল তাঁকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

রাজীর ঘনিষ্ঠজন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘দুজনই আগামীতে এমপি হতে চান। তাই তাঁদের মধ্যে এত মতবিরোধ। ঢাকায় সংসদ ভবনের সভায় ঝামেলা ও গালাগালি হয়েছে। সম্মেলন আগামী ২১ জুলাই দেবীদ্বার উপজেলা খেলার মাঠে হবেই।’

চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ করেন, ‘এটা পরিকল্পিত হামলা। দেবীদ্বারের প্রস্তুতি সভা দেবীদ্বারে হবে অথবা চান্দিনায় উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ অফিসে হবে। সেখানে না করে উত্তর জেলা সভাপতি ও এমপি সংসদ ভবনে সভা ডাকেন। আমাদের আপত্তি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত গেলাম। কিন্তু আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে এমপি আমার ওপর হামলা করেন। তিনি আমার নির্বাচনে, আমার বাবার নির্বাচনে বিরোধিতা করেন। সারা দেশে বিএনপি ও ধানের শীষের কোনো ভোট নেই, খবর নেই। কিন্তু দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে আমাকে পরাজিত করার জন্য তিনি তাঁর আপন চাচার পক্ষে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মীদের লেলিয়ে দেন। তখন প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও ভোটকেন্দ্রে রাজীর লোকজনের প্রভাবই সেটা বলে দেয়।’ তিনি বলেন, রাজীর নিজের ভোটকেন্দ্রে নৌকা ১৬ ভোট পায় উপজেলা নির্বাচনে। তিনি দলের কাছে এর বিচার চান।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম সফিকুল আলম ওরফে ভিপি কামাল বলেন, ‘দেবীদ্বারে মুন্সী পরিবারের বাইরে আর কেউ নেতা হতে পারবেন না। এ জন্য এত খেদ। এভাবে জনপ্রতিনিধির ওপর হামলা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’

কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রোশন আলী বলেন, ‘আজাদকে কিল–ঘুষি মারা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে, উচ্চবাচ্য হবে। কিন্তু গায়ে হাত তোলা উচিত না।’

কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ম রুহুল আমিন বলেন, ‘দেবীদ্বারে এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আছে। এ থেকেই হাতাহাতি হয়।’

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবন লাগোয়া ভবনের ৫০ নম্বর কেবিনে ভর্তি আছেন উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ। তাঁর শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে বলে তাঁর কর্মী–সমর্থকেরা জানিয়েছেন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন