বাবা-দাদা মন্ত্রী ছিলেন, দলীয় প্রধান হয়েও জামানত হারালেন তিনি

জেবেল রহমান গানিছবি: সংগৃহীত

দাদা ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদার সিনিয়র মন্ত্রী। দাদার মৃত্যুর পর বাবা মন্ত্রী হন। ফুফু ছিলেন সংসদ সদস্য। তিনি ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি। একাদশ ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসন থেকে দুবার অংশগ্রহণ করে দুবারই পরাজিত হয়েছেন। প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ ভোট না পাওয়ায় তাঁর জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, নীলফামারী-১ আসনে গাভি প্রতীক নিয়ে বাংলাদেশ ন্যাপের প্রার্থী জেবেল রহমান গানি ৪ হাজার ৪৭৭ ভোট পেয়েছেন। এখানে ১ লাখ ৫০ হাজার ৮২৪ ভোট পেয়ে জামায়াতের আব্দুস সাত্তার নির্বাচিত হয়েছেন।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেবেল রহমান ৪ হাজার ৯৯২ ভোট পেয়েছিলেন। তখন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের আফতাব উদ্দিন সরকার।

জেবেল রহমানের দাদা ছিলেন সাবেক সিনিয়র মন্ত্রী প্রয়াত মশিউর রহমান যাদু মিয়া। বাবা সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত শফিকুল গানি স্বপন এবং ফুফু সাবেক সংসদ সদস্য মনসুরা মহিউদ্দিন। তিনজন একই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, বাবা-দাদা-ফুফুর সঙ্গে এলাকার লোকজনের ভালো যোগাযোগ থাকলেও জেবেল রহমান সেটা রক্ষা করতে পারেননি। বিগত সময়ে তাঁদের পরিবারের প্রভাব ও জনপ্রিয়তা শীর্ষে ছিল, ধীরে ধীরে তা ম্লান হয়েছে।

জেলা নির্বাচন কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-১ আসন (বর্তমানে নীলফামারী-১) থেকে মশিউর রহমান যাদু মিয়া ন্যাপ ভাসানীর হয়ে নির্বাচন করেছিলেন। সেবার তিনি ২৮ হাজার ৮৭০ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। এরপর ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে ৪৮ হাজার ৮৩৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। সেই নির্বাচনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে তিনি (মশিউর) প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর হাতে ছিল রেলপথ, সড়ক পরিবহন, সেতু এবং সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। ১৯৭৯ সালের ১২ মার্চ মশিউর রহমানের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে তাঁর বড় ছেলে শফিকুল গানি বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৮৪ সালে রংপুর জেলাকে ভেঙে পাঁচটি জেলায় (নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা) ভাগ করা হয়। তৎকালীন রংপুর-১ আসনটিকে নীলফামারী-১ করা হয়েছিল জেলার ডোমার ও ডিমলা উপজেলা নিয়ে। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি সাবেক সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টি গঠন করলে বিএনপির রাজনীতি ছেড়ে শফিকুল গানি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। তখন জাপার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে শফিকুল গানি রংপুর-৩ ও নীলফামারী-১ আসনে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। পরে দলের নির্দেশে তিনি রংপুর-৩–এ প্রতিনিধিত্ব করেন এবং নীলফামারী-১ আসন ছেড়ে দেন।

পরে নীলফামারী-১ আসনের উপনির্বাচনে শফিকুল গানির বড় বোন মনসুরা মহিউদ্দিন লাঙ্গলের প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে নীলফামারী-১ আসনে মনোনয়ন পেয়ে পুনরায় মনসুরা মহিউদ্দিন নির্বাচিত হন। সে সময়ে জেবেল রহমানের বাবা শফিকুল গানি এরশাদের মন্ত্রিসভায় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী; শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী; যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী; বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে শফিকুল গানি জাতীয় পার্টির মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। ২০০৬ সালে ন্যাপ পুনর্গঠন করা হলে শফিকুল গানি দলটির চেয়ারম্যান হন। শফিকুল গানির সহধর্মিণী নাজহাত গানি ছিলেন বাংলাদেশ ন্যাপের উপদেষ্টা। শফিকুল গানি ও নাজহাত গানি দম্পতির বড় ছেলে জেবেল রহমান গানি, মেয়ে ফারিয়া গানি ও ছোট ছেলে মশিউর রহমান গানি।

২০০৯ সালের ২৩ আগস্ট শফিকুল গানি মারা গেলে জেবেল রহমান গানি বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান হন। ২০১২ সালে শফিকুল গানির সহধর্মিণী নাজহাত গানিও মারা যান। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জেবেল রহমান গানি নির্বাচনে অংশ নেননি। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। কিন্তু দুবারই তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. লুৎফুল কবির সরকার প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ ভোট যদি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না পান, তাহলে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়।