শিশু মাসুমার বাঁচার আকুতি, ‘আমার খুব কষ্ট, আমি কি ভালো হবো’
শিশু মাসুমা হাত বুকের ওপর রেখে আধো আধো কণ্ঠে বলছিল, ‘আঙ্কেল, আমার বুকে খুব ব্যথা হয়, জ্বরও আসে। আমার খুব কষ্ট, আমি কি ভালো হবো?’ পাশে বসে থাকা অসহায় বাবা আবদুল মান্নান এ কথা শুনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মাসুমার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। তারপরও এত সুন্দর করে কথা বলে। শুনলে যে কেউ তাকে কোলে তুলে নেয়।’
মিষ্টি চেহারার সেই মেয়ে মাসুমা আক্তারের হার্টে ছিদ্র ধরা পড়েছে। দরিদ্র ইজিবাইক চালক বাবা এক বছর ধরে মেয়েটিকে নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে ছুটছেন। চিকিৎসা করাতে গিয়ে ইতিমধ্যে চার লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। অর্থাভাবে এখন আর চিকিৎসা করাতে পারছেন না। মেয়েটির চিকিৎসার জন্য আরও ছয় লাখ টাকা প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যরা জানান, জন্মের পর থেকেই শিশুটি অসুস্থ, তার চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে গেছে।
মাসুমা ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সিতারামপুর গ্রামের আবদুল মান্নান ও রুমি খাতুন দম্পতির মেয়ে। দিপু হাসান (১৭) নামে তাঁদের আরেকটি ছেলে আছে। তাঁরা ঝিনাইদহ শহরের ভুটিয়ারগাতি এলাকায় টিনশেডের একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন। আবদুল মান্নান ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালান।
মেয়েটির মা রুমি খাতুন জানান, মাসুমার স্বাভাবিক জন্ম হয়েছিল। তখন তার ওজন ছিল মাত্র ৯০০ গ্রাম। জন্মের পর তাকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেড় মাস হাসপাতালে থাকার পর ১ কেজি ৫০০ গ্রাম ওজন হলে পর ছাড়পত্র পান। এ সময়ে তাঁদের প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়। তিনি জানান, হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফেরার এক মাস পর মাসুমার হার্নিয়া ধরা পড়ে। প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় করে যশোরে একটি ক্লিনিকে তার অস্ত্রোপচার করা হয়।
রুমি খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েটির বয়স যখন চার বছর, তখন আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে মাথা ঘুরে পড়ে, বমি করে। ঝিনাইদহ শহরে এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর প্রাথমিক ওষুধ দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য যশোরে নিতে বলেন। সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা ঢাকায় পাঠান। ঢাকার সিএমএইচের এক চিকিৎসকের কাছে নিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান, মাসুমার হার্টে ছিদ্র আছে। দ্রুত অস্ত্রোপচার করাতে হবে। এ জন্য আট লাখ টাকা খরচ হবে। চিকিৎসক যত দ্রুত সম্ভব, অস্ত্রোপচার করানোর পরামর্শ দেন, অন্যথায় সমস্যা জটিল হবে বলে জানান।
আবদুল মান্নান বলেন, এখন টাকার অভাবে মেয়ের অস্ত্রোপচার করাতে পারছেন না। মাঠে জায়গাজমি নেই। ভিটেবাড়িতে মাত্র দেড় শতক জমি আছে। তিনি এনজিও থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে একটি ইজিবাইক কিনেছেন। মাসে ১৭–১৮ হাজার টাকা আয় হয়। এর মধ্যে ১০ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। বাকি টাকায় সংসার চলে। তারপরও আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় দুই লাখ টাকা জোগাড় করেছেন। বাকি ছয় লাখ টাকার জন্য শিশুটিকে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। মাঝেমধ্যে বুকের ব্যথায় যখন ছটফট করে, তখন কান্না ছাড়া কিছুই করার থাকে না।
প্রতিবেশী রোকনুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটির অবস্থা দেখলে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। তার কণ্ঠে বাঁচার আকুতি শুনলে মনে হয়, শুধু টাকার জন্য ফুটফুটে শিশুটি হারিয়ে যাবে। তিনি বলেন, একটু সহযোগিতা পেলে মাসুমা বেঁচে যেতে পারে। অন্য শিশুদের সঙ্গে স্কুলে যাবে, এপাড়া-ওপাড়া ঘুরে বেড়াবে। তিনি সমাজের বিত্তবানদের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।