কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নির্বাচনী সমাবেশে বক্তৃতা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর প্রথম দিনে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের ছুফুয়া বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগের ওই নেতার নাম সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদার। তিনি কালিকাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ৫ আগস্টের পর তাঁকে অপসারণ করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকালে উপজেলার ছুফুয়া বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। পরে ছুফুয়া বাজারে নির্বাচনী সমাবেশে চৌদ্দগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক জিএস খলিলুর রহমান মজুমদারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। এ সময় সেখানে উপস্থিত হন আওয়ামী লীগ নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ। তখন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ঘোষণা করেন, ‘সালাউদ্দিন সাহেব এখানে এসেছেন, আমি তাঁকে স্বাগত জানাই।’ তিনি উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, ‘সালাউদ্দিন এখন আপনাদের সালাম দেবেন।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের ঘোষণার পর মঞ্চে এসে বক্তৃতা করেন সালাউদ্দিন আহমেদ। প্রায় ২ মিনিটের বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আপনারা কেন্দ্রে আসবেন, ভোট দেবেন। এখন শিক্ষিতের হার বেশি, আপনারা সবই বোঝেন। আপনারা বুঝে-শুনে নিজেদের রায় দেবেন। ভালো জায়গায় দেবেন, যেখানে দিলে কাজে লাগবে, সেখানে দেবেন। আমি এর বেশি কিছু বলব না। চৌদ্দগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির তাহের ভাইকে আপনারা এখন টিভিতে খবরে দেখেন। তিনি বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেন, বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাই ভোটে আপনারা বুঝে-শুনে রায় দেবেন। তাহের ভাই কিছুটা অসুস্থ। আমি আপনাদের কাছে তাহের ভাইয়ের জন্য দোয়া চাই এবং তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করি।’
আওয়ামী লীগ নেতার বক্তৃতা শেষে আবার মাইক্রোফোনের সামনে আসেন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। এ সময় তিনি বলেন, ‘সালাউদ্দিনের বাবা এই এলাকায় আমার অভিভাবক ছিলেন। সে কী বলতে চেয়েছে, আপনারা বুঝেছেন তো? কোথায় ভোট দেওয়ার কথা বলেছে, আপনারা বুঝে নিয়েন।’
বিষয়টি জানাজানির পর গতকাল রাত থেকে সমালোচনা শুরু হয়। এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল রাতে সালাউদ্দিন আহমেদের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি ‘হ্যালো, হ্যালো’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার কল করলেও ধরেননি। আজ শুক্রবার দুপুরে আবার কল করলে ছেলে ‘অসুস্থ, কথা বলতে পারবেন না’ বলে রেখে দেন।
এ বিষয়ে জামায়াতের প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জামায়াতের আমির মু. মাহফুজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সালাউদ্দিন আহমেদ জামায়াতে যোগদান করেননি। মূল বিষয়টি হলো, তাহের ভাইয়ের নির্বাচনী সমাবেশ তাঁর বাড়ির পাশে হয়েছে। তাহের ভাই সাবেক এমপি হওয়ায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। পরে কয়েকটি কথা বলেন। সালাউদ্দিন আহমেদ অন্য দলের হলেও তাঁর পুরো পরিবার জামায়াত করেন। এর বাইরে কিছু নয়। একটি মহল বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
থানা-পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুর এলাকায় বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে আটজনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর নিজেকে বাসের তত্ত্বাবধায়ক দাবি করে মো. আবুল খায়ের নামের এক ব্যক্তি কুমিল্লার আদালতে ওই ঘটনায় দ্বিতীয় মামলা করেন। মামলার আসামির তালিকায় সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, তৎকালীন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, র্যাবের তৎকালীন ডিজি বেনজীর আহমেদ, কুমিল্লার তৎকালীন পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তীসহ ১৩০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। মামলায় সালাউদ্দিন আহমেদ ১১ নম্বর আসামি ও তাঁর ছেলে ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নেয়ামত উল্লাহ ৭৯ নম্বর আসামি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি সালাউদ্দিন আহমেদ ও নেয়ামত উল্লাহকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন আটজনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় হওয়া দ্বিতীয় মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। কয়েক দিন পর তাঁরা জামিনে মুক্তি পান। বর্তমানে তাঁরা এলাকায় আছেন।