ভোটের আগের দিন ছয় জেলায় টাকা উদ্ধার, আটক, দণ্ড

জামায়াত নেতা বেলাল উদ্দিন প্রধানছবি: সংগৃহীত

জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের আগের দিন গতকাল বুধবার ছয় জেলায় জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীর কাছ থেকে টাকা উদ্ধার, আটক এবং একজনকে দণ্ডাদেশ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে নীলফামারীতে ৭৪ লাখ টাকাসহ জামায়াতের এক নেতাকে আটক করা হয়। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ৫০ লাখ টাকাসহ আটক করা হয় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে। আর লক্ষ্মীপুরে বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত একটি গাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় ১৫ লাখ টাকা।

নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে গতকাল বেলা ১১টার দিকে জামায়াত নেতা বেলাল উদ্দিন প্রধানকে আটক করা হয়। তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির। তাঁর বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদরের হাজীপাড়ায়। তিনি শিক্ষকতা করেন।

সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বেলালকে বিমানবন্দরে আটক রেখে থানায় খবর দেয় সেনাবাহিনী। বিমানবন্দরে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের দপ্তর সম্পাদক আবদুল মান্নান। তবে তাঁকে আটক করা হয়নি।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেলাল বলেন, ‘এখানে ৫০-৬০ লাখ, ৫০ লাখ প্লাস টাকা আছে।’ কিসের টাকা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যবসার, গার্মেন্টসের।

তবে জিজ্ঞাসাবাদের সময় বেলাল অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে প্রথমে সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। গত রাত পৌনে একটায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানে পুলিশি পাহারায় চিকিৎসাধীন ছিলেন।

বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে উল্লেখ করে নীলফামারীর পুলিশ সুপার (এসপি) শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনী পরিবেশে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বহনের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করছে জেলা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

ঠাকুরগাঁওয়ের জামায়াত নেতা আটক প্রসঙ্গে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে কর্তব্যরত কর্মকর্তারা দেখেছেন যে তাঁর ব্যাগে টাকা ছিল। ব্যাংক বন্ধ থাকায় ব্যবসার কাজে তিনি টাকা নিয়ে যেতে পারেন। এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় নেই। কিন্তু সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর পুলিশ কিছু চিহ্নিত সাংবাদিককে নিয়ে একটি নাটক সাজিয়েছে।

কলাপাড়ায় ৫০ লাখ টাকাসহ আটক

৫০ লাখ টাকাসহ আটক কলাপাড়া পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক রেজাউল করিম ওরফে কাজল মৃধা
ছবি: সংগৃহীত

পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক রেজাউল করিম ওরফে কাজল মৃধাকে ৫০ লাখ টাকাসহ আটক করেছে কোস্টগার্ড। গত রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁকে আটক করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন কলাপাড়া থানার ওসি মো. রবিউল ইসলাম।

ওসি জানান, কলাপাড়া পৌর শহরের খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনের আবাসিক এলাকা থেকে রেজাউল করিমকে ব্যাগভর্তি ৫০ লাখ টাকাসহ আটক করা হয়।

এ বিষয়ে কলাপাড়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুসা তাওহীদ নান্নু মুন্সী প্রথম আলোকে বলেন, পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক কাজল মৃধা বালু ব্যবসায়ী। টাকাসহ তাঁর আটকের ঘটনার সঙ্গে সংসদ নির্বাচন এবং বিএনপির দলীয় সম্পর্ক নেই।

ওসি মো. রবিউল ইসলাম বলেন, টাকাসহ আটক ব্যক্তিকে এখনো থানায় হস্তান্তর করা হয়নি। রাত ১২টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনি কোস্টগার্ডের হেফাজতে ছিলেন।

এ্যানির নির্বাচনী গাড়িতে ১৫ লাখ টাকা

লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত একটি গাড়ি থেকে ১৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল রাত আটটার দিকে শহরের ঝুমুর এলাকায় তল্লাশিচৌকিতে এ টাকা উদ্ধার করা হয়। এ সময় এ্যানির ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ও কৃষক দলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি বদরুল ইসলাম শ্যামলসহ তিনজনকে আটক করা হয়। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

নির্বাচন অনুসন্ধান কমিটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির সদস্য এবং লক্ষ্মীপুর জেলা জজ আদালতের বিচারক তাহরিনা আক্তার নওরিন ১৫ লাখ টাকা উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।

জানতে চাইলে রাত নয়টার দিকে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাছিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্বাচনী ব্যয় হিসেবে আমরা সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে পারব। ওই খরচের ১৫ লাখ টাকা গাড়িতে ছিল। এ বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আমরা দ্রুত এর জবাব দেব।’

রাতে একটি ভিডিও বার্তায় শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘আমি নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত আছি।...প্রকৃতপক্ষে আমার নির্বাচনী এজেন্ট সেই গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে যাচ্ছেন। সেখানে আমার যে ব্যয়, তার মধ্যে ১৫ লাখ টাকা কেন্দ্রওয়াইজ দেওয়ার জন্য যাচ্ছিল। কর্তৃপক্ষ চেক করেছে। ইতিমধ্যে কোর্ট তাঁদের রিলিজ (ছেড়ে) করে দিয়েছে। সুতরাং এ নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

মুরাদনগরে জামায়াত নেতা আটক

কুমিল্লার মুরাদনগরে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণের অভিযোগে হাবিবুর রহমান হেলালী নামে জামায়াতের এক নেতাকে গতকাল আটক করেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে থানায় নিয়ে যান। তাঁর কাছ থেকে ২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

গতকাল সকালে উপজেলার নেয়ামতকান্দি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আটক হাবিবুর উপজেলার ধামঘর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির। তাঁর বাড়িও সেখানে। তিনি উপজেলার ছালিয়াকান্দি ইউনিয়নে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক।

স্থানীয় লোকজনের দাবি, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণ করছিলেন হাবিবুর। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে হাবিবুর দাবি করেন, নির্বাচনী কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনরত জামায়াতে ইসলামীর এজেন্টদের খাবার খরচের জন্য অল্প কিছু টাকা ছিল। তাঁর গাড়িতে জোর করে অতিরিক্ত টাকা রেখে বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।

মুরাদনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের মনে হয়, জামায়াত ভোটের পরিবেশ নষ্ট করে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে।’

মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান বলেন, ‘যেহেতু ওই ব্যক্তিকে টাকা বিতরণের সময় হাতেনাতে আটক করতে পারেননি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এ জন্য আমরা বিষয়টি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে জানিয়েছি।’

জামালপুরে তিনজনের জেল-জরিমানা

জামালপুরের মাদারগঞ্জে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণের অভিযোগে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর তিন কর্মীকে গতকাল স্থানীয় লোকজন আটক করেন। খবর পেয়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাঁদের জেল ও জরিমানা করেন। গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে উপজেলার কয়ড়া বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

সাজাপ্রাপ্ত তিনজন হলেন জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির ‘বিদ্রোহী’) মো. সাদিকুর রহমানের কর্মী জহুরুল ইসলাম (৬০), জাহাঙ্গীর হোসেন (৫০) ও মেহেদী হাসান (৩৮)। তাঁদের তিনজনের বাড়ি মেলান্দহ উপজেলার ছবিলাপুর গ্রামে। তাঁদের প্রত্যেককে ১ মাসের জেল ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদিকুরের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলে তিনি ধরেননি।

মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রত্যেককে ১ মাসের কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

জামায়াতের নির্বাচনী কার্যালয়ে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা

শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভার দক্ষিণ বৈশাখীপাড়া এলাকার জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী কার্যালয় থেকে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। সেখান থেকে গোলাম মোস্তফা নামের একজকে আটক করেছে যৌথ বাহিনী। ওই টাকা জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে বিতরণের দায়ে তাঁকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যায় নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারক কমিটির বিচারক ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুজন মিয়া এই কারাদণ্ড দেন। পরে নড়িয়া থানার পুলিশ তাঁকে কারাগারে পাঠায়।

নড়িয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাস প্রথম আলোকে বলেন, ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। কার্যালয়ের ভেতরে শিক্ষক গোলাম মোস্তফাকে পাওয়া যায়, যিনি একটি ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ওই শিক্ষক সেখানে কেন গিয়েছিলেন, তার কোনো প্রমাণ দিতে না পারায় তাঁকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

শরীয়তপুর-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মিডিয়া সেলের প্রধান মাসুদ কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দুর্নাম করার জন্য অনিয়মতান্ত্রিকভাবে এ অভিযান (যৌথ বাহিনীর) চালানো হয়।’

সিরাজগঞ্জে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

সিরাজগঞ্জ-২ (সদর-কামারখন্দ) আসনের কামারখন্দ উপজেলায় নির্বাচনী কেন্দ্রের খরচের টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জামায়াতের নেতা-কর্মীরা ভোট কেনার জন্য টাকা নিয়ে বের হয়েছিলেন।

গতকাল বেলা সাড়ে তিনটার দিকে উপজেলার চৌবাড়ি গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এ ঘটনার ভিডিওতে দেখা যায়, ভোট কেনার জন্য টাকা আনা হয়েছে—এমন দাবি করে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে কয়েকজনকে নামানো হয়। তাঁদের মধ্যে রায়দৌলতপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির আবদুল মমিন ও একই ইউনিয়নের জামায়াতের যুব বিভাগের সভাপতি ইমদাদুল হক রয়েছেন। এরপর তাঁদের কাছ থেকে ৭১ হাজার টাকা উদ্ধার করেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লা আল মামুন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, টাকার অঙ্কে গরমিল এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য সন্দেহজনক মনে হওয়ায় বিষয়টি তদন্তের জন্য জুডিশিয়াল কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

কামারখন্দ উপজেলার রায়দৌলতপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান দাবি করেন, জামায়াত নেতারা ভোট কেনার জন্য এই টাকা নিয়ে মাঠে এসেছিলেন। আর জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা নায়েবে আমির আতাউর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হবে।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা]