দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে মানুষ এখন সাশ্রয়ী, বিপাকে বাদাম বিক্রেতা সুরুজ মিয়া
গলায় গামছায় ঝুড়ি ঝুলিয়ে ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করেন সুরুজ মিয়া (৬০)। কখনো সাগরপাড়ে আসা পর্যটকদের কাছে, আবার কখনো সড়কে চলাচলকারী গাড়ির চালকদের কাছে বাদাম বিক্রি করেন তিনি। বাদাম বিক্রির টাকা দিয়েই ছয় সদস্যের সংসার চালান তিনি। তাঁর ভাষ্য, আগে বাদাম বিক্রির টাকা দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চালাতে পারলেও এখন তাঁর আয় কমে গেছে। ফলে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তাঁকে।
বিক্রি কমে যাওয়ার পেছনে অর্থনীতির একটি সাধারণ তত্ত্বের উদাহরণ দেন বাদাম বিক্রেতা সুরুজ। তিনি বলেন, ‘মানুষের হাতে টাকা নেই। সে জন্য অপ্রয়োজনীয় খরচ করেন না কেউ। রাস্তাঘাটে আগের মতো বেশি মানুষ বাদাম কেনেন না। আগে আমাকে দেখলে বাদামওয়ালা বাদামওয়ালা বলে ডাক দিত লোকজন। এখন নিজে গিয়ে কিনতে বললেও অনেকে কেনেন না।’
গত পাঁচ-ছয় মাস যাবৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিজেদের ব্যয়ের ক্ষেত্রে কমিয়ে আনতে মানুষ কম বাদাম কিনছেন বলে মনে করেন সুরুজ মিয়া। তিনি বলেন, ‘পাঁচ-ছয় মাস ধরে এই অবস্থা। আগে মাসের শেষে বাড়িতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বা কখনো কখনো আরও বেশি পাঠাতাম। কিন্তু গত মাসে পাঠিয়েছি মাত্র সাত হাজার টাকা। এ মাসে দিয়েছি চার হাজার।’
সুরুজ মিয়ার বাড়ি নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলায়। সাত বছর আগে কাজের সন্ধানে তিনি চট্টগ্রাম শহরে এসে বাদাম বিক্রি শুরু করেন। এরপর থেকে এ পর্যন্ত বাদাম বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। আগে দাদনে (মালিকের) বাদাম বিক্রি করতেন। এখন নিজে বাদাম কিনে, তা ভেজে বিক্রি করেন।
গ্রামে সুরুজ মিয়ার দুই ছেলে, এক মেয়ে, স্ত্রী ও মা আছেন। সুরুজ থাকেন চট্টগ্রাম নগরের নিউ মুনছুরাবাদে। বুধবার বিকেলে সুরুজের সঙ্গে ফৌজদারহাট-বন্দর সংযোগ সড়কসংলগ্ন বেড়িবাঁধ এলাকায় দেখা হয় এ প্রতিবেদকের।
সুরুজ মিয়া বলেন, গ্রামের বাড়িতে তার দুই একরের মতো কৃষিজমি আছে। দুই মৌসুমে ধান চাষ করতেন তিনি। এতে ৪০ থেকে ৫০ মণ ধান পেতেন। তাতে কোনো রকমে কেটে গেলেও নগদ টাকার অভাব যেত না। টাকার অভাবে বড় ছেলেকে দশম শ্রেণির পর আর পড়াতে পারেননি। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি শ্রমিকের কাজ করতেন। চট্টগ্রাম আসার আছে ছেলেকে কৃষিকাজের দায়িত্ব দিয়ে আসেন। চট্টগ্রামে এসেও তিনি কিছুদিন শ্রমিকের কাজ করেন। এরপর এক বাদাম বিক্রেতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি তাঁকে চট্টগ্রামের অলংকার মোড় এলাকায় এক বাদাম দাদনদারের কাছে নিয়ে যান। দাদনদারের কাছ থেকে মূলধন ছাড়াই বাদাম নিতেন তিনি। এরপর বিক্রি করে লাভসহ টাকা পরিশোধ করতেন।
সুরুজ মিয়া জানান, এভাবে দাদন নিয়ে পাঁচ বছর বাদাম বিক্রি করেছেন তিনি। কিন্তু সমস্যা হলো বাজারে বাদাম ১০০ টাকা কেজি হলে, দাদনদার থেকে নিতে হতো ১৩০ টাকা কেজি দরে। এরপর দাদনদারের চুলায় কেজিপ্রতি ২৫ টাকা দিয়ে ভাজতে হতো। এভাবে প্রতিটি বাদামবিক্রেতা থেকে দাদনদার দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করতেন। যদি তিনি দাদন না নিতেন, তাহলে ওই টাকা তাঁর থাকত। তাই কিছু টাকা জমিয়ে দুই বছর ধরে দাদন না নিয়ে নিজেই ব্যবসা শুরু করেন।
সুরুজ মিয়া বলেন, নিজের ব্যবসা শুরুর পর ভালোই চলছিলাম। মাস শেষে বাড়িতে ভালোই টাকা পাঠাতাম। কিন্তু ছয় মাস হলো তেমন আয় হচ্ছে না। মানুষ বাদাম কেনা কমিয়ে দিয়েছে। কিনবেই বা কেমন করে। মানুষের হাতে টাকা নেই।
সুরুজ মিয়া বলেন, ‘ছয়-সাত মাস আগে থেকে একটার পর একটা জিনিসের দাম বেড়েই চলেছে। এখন আমার মতো মানুষেরা ডাল-ভাত খেতে কষ্ট হচ্ছে। বাদাম কিনবে কেন তারা? তা ছাড়া বাদামের দামও বেড়ে গেছে। আগে কাঁচা বাদাম কিনতাম ১২০ টাকায়। এখন সেই বাদাম কেজি কিনতে হচ্ছে ২০০ টাকা দিয়ে। ভাজতে খরচ ৩০ টাকা। আগে প্রতি কেজি বাদাম বিক্রি করতাম ২৫০ টাকায়। সকাল থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে দৈনিক ৮ থেকে ১০ কেজি বাদাম বিক্রি করতাম। এখন প্রতি কেজি বাদাম ৪০০ টাকা বিক্রি করতে হচ্ছে। দিনে ২ কেজিও বিক্রি হয় না।’
সুরুজ মিয়া বলেন, সারা দিন হাঁটার পর পায়ে ব্যথা করে। উচ্চ রক্তচাপ আছে তাঁর। এসবের কারণে প্রতিদিন ওষুধ খেতে হয়। বাড়িতে গিয়ে যে অন্য কোনো কাজ করবেন তারও সুযোগ নেই। তাই বাদাম বিক্রি করেই চলতে হবে। কিন্তু বিক্রি কীভাবে বাড়াবেন, তা বুঝতে পারছেন না।