পাঠাগার ঘিরে পরিবর্তনের স্বপ্ন

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের ঘাগটিয়া গ্রামে পাঠাগারটি অবস্থিত। একে ঘিরে নানা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন গ্রামের মানুষ।

‘ঘাগটিয়া গণগ্রন্থাগার’–এ বই পড়ায় ব্যস্ত একদল তরুণ। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

একদল তরুণ উদ্যোগী হয়ে গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন পাঠাগার। এতে যুক্ত হয়েছেন শিক্ষকসহ নানা পেশার মানুষ। গ্রামের স্কুল ও কলেজপড়ুয়াদের এখন সময় কাটে পাঠাগারে বই পড়ে, সাহিত্যের আড্ডায়। এক সময় ঘুরে ঘুরে বই সংগ্রহ করতে হয়েছে তাঁদের। এখন এই তরুণেরাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিলি করেন বই। শুরুতে ভাড়া করা ঘরে কার্যক্রম চললেও এখন পাঠাগারের নিজস্ব জমিতে পাকা ঘর হয়েছে।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামে এই পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নাম ‘ঘাগটিয়া গণগ্রন্থাগার’। এই পাঠাগার ঘিরে গ্রামের শিক্ষা, সামাজিকতায় পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন মানুষজন।

শুরুর কথা

ঘাগটিয়া গ্রামটি সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। বেশ বড়সড় গ্রাম। গ্রামজুড়ে প্রচুর গাছগাছালি। শান্ত, নিরিবিলি এই গ্রামে আছে হাজারখানেক পরিবার। মানুষজন ব্যবসা ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। করোনাকালে স্কুল-কলেজ বন্ধ। অবসর সময়। এই অবসরে স্কুল ও কলেজপড়ুয়া তরুণেরা ঘোরঘুরি আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়েই ব্যস্ত। অবসরে কী করা যায়, এ নিয়ে ভাবেন কয়েক তরুণ। সেই ভাবনা থেকেই পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। এরপর গ্রামের সব বয়সী মানুষকে নিয়ে এক রাতে গ্রামের মাঠে বৈঠকে বসেন তাঁরা। তরুণদের এই উদ্যোগে সবাই সম্মতি দেন। ২৫ জন তরুণকে দিয়ে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়। উপদেষ্টা রাখা হয় এলাকার কয়েকজন শিক্ষক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিকে। সবার মতামতের ভিত্তিতে বাজারে একটি ঘর ভাড়া নেওয়া হয়। স্থানীয় লোকজন চাঁদা দিয়ে কিছু আসবাব কেনেন। তরুণেরা নেমে পড়েন বই সংগ্রহে। ‘জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হোক আগামী প্রজন্ম’ স্লোগানে ২০২০ সালের ৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠাগার খুলে দেওয়া হয়।

ঘাগটিয়া গণগ্রন্থাগার পরিচালনা কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অমিয় হাসান স্থানীয় বাদাঘাট সরকারি কলেজের স্নাতক শেষ বর্ষের ছাত্র। এখন তিনি পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। একজন শিক্ষক আছেন সভাপতি হিসেবে। অমিয় হাসান বলেন, ‘করোনায় যখন তাঁরা অনেকটা বেকার। তখন অনেকেই ঘোরঘুরি আর ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত। একদিন কয়েকজন মিলে কী করা যায়, এ নিয়ে আলোচনা করার পরই পাঠাগারে চিন্তাটা মাথায় আসে। পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে এলাকার সবাই উৎসাহ দেন। দুই বছরে গ্রামের ছেলেমেয়েদের মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই পাঠাগারে এসে বই পড়ে। আবার আমরাও বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই বিলি করি। আমাদের চিন্তা হচ্ছে, পাঠাগারে স্কুল ও কলেজের পাঠ্যসূচির বই রাখা। যাতে এলাকার অসচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরা এখন থেকে বই নিয়ে পড়তে পারে।’

পাঠাগারে এক বিকেল

পাঠাগারে নানা বয়সী মানুষ বই পড়েন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন স্কুলের শিক্ষার্থীরাও। এক কক্ষের আধাপাকা ঘর। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে বই পড়েন। একপাশে একটি আলমিরাতে বই রাখা। বইয়ের তাকে আলাদা করে লিখে রাখা হয়েছে পরিচিতি। প্রবন্ধ, সাহিত্য, কবিতা, বিজ্ঞান, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, কিশোর সাহিত্য, উপন্যাস, রাজনীতি, ইতিহাস, খেলাধুলা, শিশুদের গল্প ও ধর্মীয় বই রয়েছে পাঠাগারে।

পাঠাগার পরিচালনা কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাসরুল হাসান বলেন, পাঠাগারে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০টি বই আছে। শুরুতে পাঠাগার বেলা তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকত। এখন দিনের বেশির ভাগ সময়ই খোলা থাকে। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জন পাঠক আসেন। এ ছাড়া তাঁরা নিজেরাও বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই দিচ্ছেন। এখানে মাসিক সাহিত্য সভা, পুঁথিপাঠের আসরের আয়োজন হয়। এতে গ্রামের লোকজন অংশ নেন। পাঠাগারে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন সদস্যরা।

পাঠাগারে কথা হয় গ্রামের দশম শ্রেণির ছাত্র মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। সে এখন পাঠাগারে নিয়মিত আসে। কবিতা ও গল্পের বই তার পছন্দ। মোস্তাফিজুর বলে, স্কুলের সময়ের পর পাঠাগারে আসি। বই পড়ি। বাড়িতে থাকা কলেজপড়ুয়া বড় বোন তানিয়া আক্তারের জন্য সে এখান থেকে বই নিয়ে যায়। 

ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা একরামুল হক সিলেটের একটি কলেজে পড়েন। তিনি জানান, করোনা শুরুর পর থেকে গ্রামেই ছিলেন। পাঠাগারের শুরু থেকেই তিনি এটির সঙ্গে যুক্ত। পাঠাগারে গ্রামের তরুণদের বই পড়ায় উৎসাহ বাড়ছে। সব বয়সী লোকজন পাঠাগারে আসেন।

পাঠাগারের বর্তমান সভাপতি শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু ছাপা কাগজের বইয়ের ঘ্রাণ, তার মূল্য আলাদা। আলোকিত মানুষ হতে হলে বই পড়তে হবে। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে আমরা এর অভাব বোধ করি। এই পাঠাগার আমাদের নতুন প্রজন্মকে আলো দেবে, আলোকিত করবে। এই চিন্তা থেকে এটিকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা।’

স্থায়ী ঠিকানার উদ্যোগ

ঘাগটিয়া গ্রামের তরুণদের এই উদ্যোগে খুশি এলাকার মরুব্বিরাও। তাই একপর্যায়ে পাঠাগার যাতে স্থায়ী ঠিকানা পায়, সেই উদ্যোগ নেন তাঁরা। ঘাগটিয়া বাজারেই পাঠাগারের নিজস্ব ঘর করার জন্য এক শতক জমি দেন গ্রামের বাসিন্দা পল্লিচিকিৎসক তোয়াজ আলী। স্থানীয় বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) একটি বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে একটি আধা পাকা ভবন নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ছয় লাখ টাকা। ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০২০ সালের ৯ অক্টোবর। ২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪ ফুট প্রস্থ্যের এই ঘর নির্মাণকাজ শেষের পর উদ্বোধন হয় গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর। আপাতত ওপরে টিনের চালা দেওয়া হয়েছে। ইচ্ছে করলে এটি তিনতলা পর্যন্ত করা যাবে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঠাগার পরিচালনা কমিটির উপদেষ্টা কাসমির রেজার এ–সংক্রান্ত একটি পোস্ট দেখে পাঠাগারের ঘর নির্মাণে সহায়তার আশ্বাস দেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এলজিএসপি প্রকল্পের পরিচালক এনামুল হাবিব। তাঁর নির্দেশনাতেই বাদাঘাট ইউপির পক্ষ থেকে এই ঘর নির্মাণের উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। ঘরটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি।

পাঠাগারের জমিদাতা তোয়াজ আলী বলেন, ‘গ্রামের তরুণদের এই মহতী উদ্যোগে আমরা খুবই খুশি। সবাই মিলে আমাকে জমি দিতে বলায় আমি পাঠাগারের নামে এই জমি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছি।’ গ্রামের বাসিন্দা পাঠাগার পরিচালনা কমিটির উপদেষ্টা ও সমাজকর্মী কাসমির রেজা বলেন, গ্রামের তরুণদের উৎসাহ দেখে মুগ্ধ। এটি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতা বিকাশে ভূমিকা রাখতে এবং গ্রামের শিক্ষাসহ নানা উন্নয়নের কেন্দ্রে পরিণত হবে—এটাই আমাদের স্বপ্ন।’