সিলেটের বন্ধ থাকা আটটি পাথর কোয়ারি চালুর দাবিতে পরিবহনশ্রমিকেরা কিছুদিন ধরে নানা কর্মসূচি পালন করছেন। এমনকি পরিবহন ধর্মঘটও করেছেন। কী বলবেন?

শাহ সাহেদা: এ ক্ষেত্রে প্রথমে আমাদের দেখতে হবে পাথর কোয়ারিগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কারণগুলো। যখন বড় বড় যন্ত্র দিয়ে পাথর তোলা হচ্ছিল, কৃষিজমি, টিলা, নদীর পাড়, ঘরবাড়ি—সব হয়ে গিয়েছিল পাথর কোয়ারি। রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পাশাপাশি প্রাণহানি তো ঘটছেই। বেলার দায়ের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত ২০১০ সালে যান্ত্রিকভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ করার জন্য রায় দেন। পরবর্তী সময়ে বেলার আরেকটি রিট আবেদনের রায়ের ফলে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। অথচ দীর্ঘদিন সে রায় বাস্তবায়িত হয়নি।
পরে ২০২০ সালের ৮ জুন খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো এক চিঠির মাধ্যমে সারা দেশের পাথর, সিলিকা বালু, নুড়িপাথর, সাদা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ করে। এর পর থেকেই পাথর উত্তোলন বন্ধ আছে। এখন সিলেটে পাথর তোলার মতো জায়গা আর নেই। তা ছাড়া জাফলং ইসিএ ঘোষিত হওয়ায় এখানে পাথর কেন, সব ধরনের খনিজ সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ। তাই পাথর কোয়ারি চালু করার দাবি বা এর জন্য পরিবহন ধর্মঘট ডাকা একেবারেই অযৌক্তিক।

পাথর কোয়ারি যদি চালু করে দেওয়া হয়, তাহলে পরিবেশ ও জনজীবনের কী ক্ষতি হতে পারে?

শাহ সাহেদা: ২০০৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত যখন ব্যাপকভাবে পাথর তোলা হয়, সে সময়টাতে কী কী ক্ষতি হয়েছে, সেটা এ ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে। সিলেটের ৮টি পাথর কোয়ারি মিলে সর্বমোট পরিমাণ হলো ১ হাজার ১৭৫ দশমিক ৪৫ হেক্টর। কিন্তু পাথর উত্তোলন করা হয়েছে ইচ্ছেমতো। তখনই পরিবেশ-প্রকৃতি ধ্বংসের পাশাপাশি রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীভাঙন, ভূমিধস হয়েছে। প্রাণহানি ঘটেছে। এখন পাথর কোয়ারিগুলো চালু না থাকায় কিছুদিন ধরে এসব বন্ধ আছে। আমরা আশা করছি, হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতি কিছুটা হলেও এতে ফিরে আসবে।
কিন্তু আবার যদি অন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে সরকার পাথর কোয়ারি চালু করে, তাহলে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হবে। আগের ক্ষতি পূরণ হওয়ার তো সুযোগই থাকবে না, বরং আমাদের পানি, বাতাস দূষিত হবে। জীববৈচিত্র্য আরও বিপর্যস্ত হবে, সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্প বাধাগ্রস্ত হবে। সরকারের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর স্বাভাবিকভাবেই এসবের কুফল মানুষকেই ভোগ করতে হবে, যেমনটা অতীতে হয়েছে। এ ছাড়া প্রাণহানির তালিকা আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা তো আছেই। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হবে, একবার অন্যায্য দাবি মেনে নিলে তাঁদের (পাথর ব্যবসায়ীদের) কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এতে বেআইনি কার্যক্রমে উৎসাহ বাড়াবে।

পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে অনেক শ্রমিকও তো নানা সময়ে মারা গেছেন। এ বিষয়ে যদি কিছু বলতেন।

শাহ সাহেদা: পাথর উত্তোলনকালে গত ১৬ বছরে সিলেটের বিভিন্ন স্থানে ১০৬ জন শ্রমিক মারা যান। ২০০৫ থেকে ২০২১ পর্যন্ত এসব শ্রমিক মারা যান। একই সময়ে আহত হয়েছেন ৩৮ জন শ্রমিক। তবে স্থানীয় অনেকেই মনে করেন, এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তবে পাথর তুলতে গিয়ে যখন কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, তখনই এটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলে। অনেক সময়ই স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন কিছুই বলতে পারে না। তখন সত্যটা জানতে আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়। স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, শহরের হাসপাতালগুলোতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে আমাদের সত্যটা জানতে হয়েছে। সরকারি হিসাবে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নিহত শ্রমিকের সংখ্যা ৮১ বলা হয়েছে। আমরা কখনোই দেখিনি, দায়ী ব্যক্তিকে মারা যাওয়া শ্রমিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে কিংবা অবৈধ কার্যক্রমের দায়ে কখনো আইনের মুখোমুখি হতে। এখন যাঁরা শ্রমিকদের দোহাই দেন, তখন কি শ্রমিকদের জন্য কোনো কথা বলার ছিল না?

সিলেটের যেসব স্থান সরকারিভাবে পাথর কোয়ারি হিসেবে স্বীকৃত, সেগুলোর প্রতিটিই সুপ্রসিদ্ধ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। অবাধে পাথর উত্তোলনের কারণে এসব পর্যটনকেন্দ্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ আছে। কী বলবেন?

শাহ সাহেদা: সিলেটের ৮টি পাথর কোয়ারির সব কটিই কোনো না কোনোভাবে প্রাকৃতিক গুরুত্ব বহন করে। পাথর কোয়ারিগুলো বন, বাগান, নদী, টিলাকেন্দ্রিক হওয়ায় এগুলোর সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। যে কারণে এসব স্থান পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। শাহ আরফিন টিলা এখন নেই। জাফলং, উৎমাছড়া, বিছনাকান্দি, ভোলাগঞ্জ, লোভাছড়া এলাকাগুলো বলা যায় এখন বিরানভূমি। শ্রীপুরও সৌন্দর্য হারাচ্ছে। শব্দ আর ধুলাবালু, পাথরবাহী ভারী ট্রাক ও ট্রাক্টরের আনাগোনা, এটাই ছিল এসব এলাকার সারাক্ষণের চিত্র। পাথরের গাড়ি চলাচলের কারণে রাস্তাঘাট বেহাল হয়। সব মিলিয়ে সিলেটে পর্যটক কমতে শুরু করে।
গত তিন থেকে চার বছর প্রকৃতির ওপর অত্যাচার বন্ধ হওয়ায় এসব এলাকা একটু মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এতে পর্যটকেরাও আসতে শুরু করেছেন। পাথর তুলে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে রাজস্ব এসেছে ৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আবার ২০০৪ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ৫ বছরে পাথর উত্তোলনের কারণে ক্ষতি হয়েছে ২৫১ কোটি ৫৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। কিন্তু আমরা যদি প্রকৃতির যত্ন নিতাম, পাথর আহরণের নামে ছিন্নভিন্ন না করতাম, তাহলে দুই দিকেই লাভ হতো। প্রথমত, আমাদের এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অক্ষত রাখতে পারতাম। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রিত পর্যটকের মাধ্যমেও রাজস্ব অর্জন অসম্ভব ছিল না। এককথায় বলা যায়, পাথর উত্তোলন করার কারণে সব দিকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিলেট।