তাপপ্রবাহের কুড়িগ্রামে শীতল এক গ্রাম শিতলীরপাঠ

আশপাশের এলাকার তুলনায় এই গ্রামের তাপমাত্রা অন্তত দুই থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে। সোমবার বিকেলে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের শিতলীরপাঠ গ্রামেছবি: প্রথম আলো

দুপুরের রোদ তখন মাথার ওপর। রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কের চওড়া বাজারের রাস্তার পাশের চায়ের দোকানগুলো ফাঁকা হয়ে এসেছে। গাছের ছায়ায় রিকশা রেখে কপালের ঘাম মুছছেন চালক। দূরের মাঠে দু-একজন কৃষক গামছা মাথায় দিয়ে তাড়াহুড়ো করে কাজ সারছেন, যেন সূর্য থেকে আগুন ঝরছে।

গত ১ জুন (সোমবার) দুপুরে সেখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে ঢুকতেই মনে হলো, ঋতু বদলে গেছে। বাতাসে নেই ভ্যাপসা গরমের দমবন্ধ অনুভূতি। চারপাশে ঘন সবুজ, পাখির ডাক আর পুকুরঘেরা বসতি। রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের সেই গ্রামের নাম শিতলীরপাঠ। কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে ছিনাই ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিমে গ্রামটির অবস্থান। এক পাশে সিংগিমারী পাড়া, অন্য পাশে বানেশ্বর পাড়া। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে প্রায় দেড় কিলোমিটারের এই গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে আঁকাবাঁকা মেঠো পথ। পথের দুই পাশে সুপারিবাগান, পুরোনো আমগাছ, লটকনের ঝোপ আর ঘন সবুজের ছাউনি। প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশে ছোট-বড় পুকুর।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আশপাশের এলাকার তুলনায় এ গ্রামের তাপমাত্রা অন্তত দুই থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে। চওড়া বাজার বা ছিনাই বাজারে যে গরম অনুভূত হয়, শিতলীরপাঠে তার অনেকটাই অনুপস্থিত।

স্থানীয়দের এ দাবির সঙ্গে মিল পাওয়া যায় সাম্প্রতিক আবহাওয়ার তথ্যেও। রাজারহাট আবহাওয়া ও কৃষি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ মে জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ৩১ মে ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ১ জুন ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১ জুন দুপুরে মুঠোফোনের অ্যাপে জেলা শহরের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি দেখা গেলেও শিতলীরপাঠ এলাকায় তা ছিল ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

বানেশ্বর পাড়ার কালীমন্দির এলাকার কৃষক বিষ্ণু চন্দ্র রায় (৪৫) বলেন, এই গ্রাম ঠান্ডা-শীতল। অন্য এলাকায় কাজে গেলে তাপ বেশিই লাগে। শিতলীরপাঠ গ্রামে দুপুর কাজ করলেও শরীর ঘামে না। চারদিকে ছায়া, বাতাস ঠান্ডা। শরীরে ক্লান্তি কম লাগে। শিতলীরপাঠ গ্রামের যে মানুষটি সবচেয়ে গরিব, তার বাড়িতেও একটি ছোট সুপারিবাগান আছে। কারও এক শতকের ছোট জলাশয়, আবার কারও রয়েছে মাছের বড় ঘের। বাগানের সুপারি, পুকুরের মাছ শুধু খাবার নয়, অভাবের দিনে সংসারের ভরসা।

গাছপালায় ঘেরা গ্রাম। সোমবার বিকেলে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের শিতলীরপাঠ গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

শিতলীরপাঠ গ্রামের গৃহবধূ বুলো রানী (৬০) বলেন, ‘এই গ্রামের সগারে (সবার) বাড়ি বাড়ি পুকুর আছে। আপনারা শহরের মানুষ মাছ কিনে ফ্রিজে রাখেন। আমরা পোনা মাছ পুকুরে ছাড়ি। দরকার হলে দুটা তুলে খাই, দুটা বেচে ছাওয়ার (সন্তানের) পড়ালেখার খরচ চালাই।’

বিকেলের দিকে গ্রামের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে শিতলীদেবীর মন্দিরসংলগ্ন এলাকা। বিশাল দুটি বটগাছের ছায়ায় বসেন গ্রামের প্রবীণেরা। পাশে কয়েকটি ছোট চায়ের দোকান। এসব দোকানের বেশির ভাগই পরিচালনা করেন নারীরা। আড্ডা, গল্প, সাংস্কৃতিক আয়োজন—সবকিছুরই মিলনস্থল এই জায়গা। শিশুদের জন্যও রয়েছে এক ব্যতিক্রমী আয়োজন। গ্রামের ‘মায়ের তরীর গুরুগৃহ’ নামের সংগীত বিদ্যালয়ে শতাধিক শিশু গান শেখে। নরওয়ের কবি ও গবেষক ভেরা সেদার (৮০) এ গ্রামের পরিবেশে মুগ্ধ হয়ে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেন।

শিতলীরপাঠকে অনেকেই কুড়িগ্রামের সবচেয়ে নৈসর্গিক গ্রামগুলোর একটি বলে মনে করেন। মেঠো পথ, ছায়াঘেরা গাছপালা, পুকুরপাড় আর পাখির ডাক—সব মিলিয়ে যেন হারিয়ে যাওয়া এক বাংলার ছবি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাখিপ্রেমী ও আলোকচিত্রীদের কাছেও শিতলীরপাঠ পরিচিত একটি নাম। বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলে খুব কম দেখা যায় এমন কয়েকটি পাখিরও আশ্রয় এই গ্রাম। সিঁদুরে মৌটুসী, লালঘাড় পেঙ্গা, গলাফোলা ছাতারে, ধূসর হাঁড়িচাচা ও বনসুন্দরীর মতো পাখির দেখা মেলে এখানে। পাখির ছবি তুলতে নিয়মিত আসেন দেশের খ্যাতিমান আলোকচিত্রীরা।

‘ঢাকার পাখি: ছোট হয়ে আসছে আকাশ’ প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতা আসকার ইবনে ফিরোজ বলেন, ‘লালঘাড় পেঙ্গা সাধারণত শালবনে দেখা যায়, সেটিও এক-দুটি করে। কিন্তু শিতলীরপাঠে আমি একসঙ্গে ৮ থেকে ১০টি পাখি দেখেছি। সিঁদুরে মৌটুসীও সাধারণত পাহাড়ি বা টিলা অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। সমতলের একটি গ্রামে এদের উপস্থিতি সত্যিই বিস্ময়কর।’

এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশেই ছোট-বড় পুকুর রয়েছে। সোমবার বিকেলে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের শিতলীরপাঠ গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, একটি এলাকার তাপমাত্রা শুধু আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে না, স্থানীয় পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিতলীরপাঠে বড় বড় গাছ, অসংখ্য পুকুর ও জলাভূমি রয়েছে। এগুলো তাপ শোষণ করে, বাতাসের আর্দ্রতা ধরে রাখে ও ছায়া তৈরি করে। এতে এখানে তুলনামূলক শীতল পরিবেশ গড়ে উঠেছে। তাপপ্রবাহের এ সময়ে শিতলীরপাঠ অন্য এলাকার জন্য একটি উদাহরণ হতে পারে। পুকুর-জলাশয় সংরক্ষণ, দেশীয় গাছ রোপণ ও বাড়ির চারপাশে সবুজ আচ্ছাদন বাড়ালে স্থানীয় পর্যায়ে তাপমাত্রা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের মাধ্যমে তার ক্ষতি অনেকটাই কমানো যায়।

তবে কুড়িগ্রাম জেলার সামগ্রিক চিত্র ভিন্ন। গত এক দশকে জেলার আবহাওয়া বদলে গেছে। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টি কমছে। রাজারহাট আবহাওয়া ও কৃষি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় কুড়িগ্রামে তাপপ্রবাহের প্রবণতা বাড়ছে। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ছয় বছরে জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু শিতলীরপাঠে এসে মনে হয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে তাপপ্রবাহের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।