নরসিংদীর সেই কিশোরীকে ‘হত্যা করেন সৎবাবা’, দায় এড়াতে ‘অপহরণের নাটক’
নরসিংদীতে এক কিশোরী হত্যা মামলায় তাঁর সৎবাবা আশরাফ আলীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরই মধ্যে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। আজ শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ-আল-ফারুক।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের বিলপাড় ও দড়িকান্দীর মাঝামাঝি একটি শর্ষেখেত থেকে ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। সে সময় অভিযোগ উঠেছিল, ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। এখন পুলিশ বলছে, ওই কিশেোরীর সৎবাবাই তাকে হত্যা করেছে।
পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ-আল-ফারুক আজ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ওই কিশোরীর বাবা বলেন, কিশোরীর নানা কর্মকাণ্ডে বিরক্ত ও সামাজিকভাবে বিভিন্ন সময়ে হেয়প্রতিপন্ন হয়ে তিনি একা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। হত্যার দায় অন্যদের ওপর চাপাতে অপহরণের নাটক সাজিয়েছিলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, মামলার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরার সঙ্গে ওই কিশোরীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। হত্যাকাণ্ডের ১০–১২ দিন আগে আসামি হযরত আলীর বাড়িতে কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর বিচার চাইতে মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য আহম্মদ আলী দেওয়ানের কাছে যান তাঁরা। পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী থানার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের বিলপাড় ও দড়িকান্দীর মধ্যবর্তী একটি শর্ষেখেত থেকে ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। রাতেই ৯ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আর দুই-তিনজনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা করেন ওই কিশোরীর মা।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আরও বলেন, এ মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাসহ আট আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের সবার আট দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলেও হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। গতকাল শুক্রবার ৬ মার্চ ওই কিশোরীর সৎবাবা আশরাফ আলীকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। একপর্যায়ে তিনি পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার করেন। পরে তাঁকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ আদালতে পাঠানো হলে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
সৎবাবা আশরাফ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, হত্যাকাণ্ডের রাতে ওই কিশোরীকে নিয়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একজন সহকর্মীর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। নির্জন এক শর্ষেখেতের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ওই কিশোরীকে পেছন থেকে তারই ওড়না দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরেন তিনি। পরে ওই শর্ষেখেতে শ্বাস রোধ করে হত্যার পর তাঁর লাশ সেখানেই রেখে বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। পরে তিনি অপহরণের নাটক সাজান।
পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ-আল-ফারুক জানান, আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৯ আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। তাঁদের মধ্যে হত্যার অভিযোগে একজন, ধর্ষণের অভিযোগে চারজন এবং অবৈধ সালিশে জড়িত থাকার দায়ে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে সৎবাবা আশরাফ আলী, নূর মোহাম্মদ নূরা ও হযরত আলী আদালতে জবানবন্দি দিয়ে দায় স্বীকার করেছেন।
সৎবাবা আশরাফ আলী (৪০) ছাড়াও এ মামলার গ্রেপ্তার ৮ আসামি হলেন নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা (২৮), এবাদুল্লাহ (৪০), হযরত আলী (৪০), মো. গাফফার (৩৭), আহাম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), ইমরান দেওয়ান (৩২), ইছহাক ওরফে ইছা (৪০) ও মো. আইয়ুব (৩০)। আবু তাহের নামের এক আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। মহিষাশুড়া ইউপির সাবেক সদস্য আহম্মদ আলী দেওয়ান ইউনিয়ন বিএনপির সদ্য বহিষ্কৃত সহসভাপতি।