অ্যাসাইনমেন্টে শিক্ষকের নামের বানান ভুল, ৩০০ বার লিখিয়ে ‘শাস্তি’
অ্যাসাইনমেন্টে কোর্স শিক্ষকের নামের বানান ভুল লেখার কারণে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২ শিক্ষার্থীকে ৩০০ বার করে শিক্ষকের নাম সঠিক বানানে লিখে জমা দিতে বলা হয়। পরে এক শিক্ষার্থী সেই শাস্তির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও অনলাইনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মরিয়ম হাসনা ২৯ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওই নির্দেশ দেন। শিক্ষকের দেওয়া এই শাস্তি নিয়ে শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
এর মধ্যে বিভাগের তৃতীয় বর্ষের (দ্বিতীয় সেমিস্টার) শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম ৩০০ বার শিক্ষকের নাম লিখে জমা দেওয়া কাগজের ছবি গত বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেন। ফেসবুক পোস্টে সাইদুল লেখেন, ‘গত রাতটি আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় একটি অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। একটি শব্দের বানানে মাত্র একটি অতিরিক্ত অক্ষর—‘Morioum’-এর পরিবর্তে ‘Morium’—লেখার কারণে আমাকে পুরো নাম ৩০০ বার সংশোধন করতে হয়েছে।’
পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক শিক্ষার্থী এমন শাস্তির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ এটিকে শিক্ষার্থীদের প্রতি মানসিক হয়রানি বলেও মন্তব্য করেন।
বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী রেদোয়ান সরকার এক পোস্টে মন্তব্য করেন, ‘কত কত অযাচিত অ্যাসাইনমেন্ট করেছি, তার হিসাব নেই। ক্রিয়েটিভিটি বলতে দেখে দেখে অ্যাসাইনমেন্টের এই ধরনের র্যাগিংই হয় এখানে। শিক্ষক কর্তৃক নানান র্যাগিংয়ের সম্মুখীন হওয়া খুবই মামুলি বিষয় এই বিভাগে।’
গত রাতটি আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় একটি অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। একটি শব্দের বানানে মাত্র একটি অতিরিক্ত অক্ষর—‘Morioum’-এর পরিবর্তে ‘Morium’—লেখার কারণে আমাকে পুরো নাম ৩০০ বার সংশোধন করতে হয়েছে।সাইদুল ইসলাম, শিক্ষার্থী
আজ শনিবার বিকেলে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সহকারী অধ্যাপক মরিয়ম হাসনার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার পর তিনি গতকাল শুক্রবার রাতে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ‘৩০০ বার কোর্স টিচারের শুদ্ধ নাম লিখে আনার অ্যাসাইনমেন্ট প্রসঙ্গে’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন।
সেখানে মরিয়ম জানান, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের (২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়নের সময় তিনি দেখতে পান, ৫৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩২ জন তাঁর নামের বানান ভুল লিখেছেন। স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘কোর্স টিচার হিসেবে আমার দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের খুঁটিনাটি ভুলও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা। একটি ফরমাল একাডেমিক পেপারে শিক্ষকের নামের বানান ভুল দায়িত্বে অবহেলার পরিচয় দেয়। আজকের ডিজিটাল যুগে একটি “লেটার” বা “ক্যারেক্টার” ভুল হলেও অনেক সময় পুরো প্রক্রিয়া আটকে যায়। ভবিষ্যতে যেন শিক্ষার্থীরা এমন ভুল না করে, সে কারণেই যারা ভুল করেছে, তাদের ৩০০ বার সঠিক বানানে নাম লিখে আনতে বলেছি।’
কোর্স টিচার হিসেবে আমার দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের খুঁটিনাটি ভুলও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা। একটি ফরমাল একাডেমিক পেপারে শিক্ষকের নামের বানান ভুল দায়িত্বে অবহেলার পরিচয় দেয়।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে মরিয়ম লেখেন, বিষয়টি প্রথমে ইতিবাচকভাবেই নিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে আরও বেশি শিক্ষার্থী সতর্ক হবেন। কিন্তু পরে বিভিন্ন ফেসবুক পেজে তাঁর ছবি ব্যবহার করে পোস্ট করা হয় এবং অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসতে শুরু করে, যা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে বিঘ্নিত করেছে।
স্ট্যাটাসের শেষাংশে শিক্ষক মরিয়ম হাসনা লেখেন, ‘যাঁরা এসব করছেন, তাঁদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। শুধু আক্ষেপ, শিক্ষার্থীদের বড় ক্যারিয়ার গঠনে হয়তো আমরা ভূমিকা রাখতে পারছি, কিন্তু অনেককে দায়িত্বশীলতা শেখাতে পারছি না। শিক্ষক হিসেবে সেই ব্যর্থতা আমাদেরই।’
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ দেননি বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. মেহেদী হাসান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ভিত্তিতে তদন্ত করার বিধান নেই। তবে যদি অভিযোগ আসে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।