এবায়দুল্লাহ সম্পর্কে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক কলেজ অধ্যক্ষ সুভাষ সরকার বলেন, অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী ডাক্তার এবায়দুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে একরকম বিনা পয়সায় সাতক্ষীরার মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘জনতার ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত। এই যুগে তাঁর মতো মানুষ বিরল। তাঁকে কখনো টাকার পেছনে ছুটতে দেখা যায়নি।

দাদার অনুপ্রেরণা

ছোটকাল থেকে নানা সামাজিক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবায়দুল্লাহ। তাঁর দাদা নবাব আলী সরদারও সামাজিক কাজ করতেন। এলাকার মানুষ, আত্মীয়স্বজন বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়াতেন। দাদার খুব ইচ্ছা ছিল, তিনি (এবায়দুল্লাহ) চিকিৎসক হয়ে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। দাদার ইচ্ছাতেই তিনি মেডিকেলে ভর্তি হন। ১৯৮০ সালে সাতক্ষীরা শহরের পাকাপোলের মোড়ে চেম্বার নেন। একসময় উপলব্ধি করেন, চিকিৎসকের ফি দিতে গিয়ে অনেক রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধই কিনতে পারেন না। তিনি নিজের ফি ৫ টাকা নির্ধারণ করেন। দাদার নাম অনুসারে তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম দেন নবাব ক্লিনিক। সেই ’৮০ সাল থেকে নিয়ম করে রোজ বেলা সাড়ে তিনটা থেকে চেম্বারে বসে রোগী দেখেন। ২০১০ সালে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর সকাল-বিকেল দুই বেলা রোগী দেখা শুরু করেন। ৫ টাকার ফি বাড়িয়ে নেন ১০ টাকা।

ফি বাড়ানোর কারণ হিসেবে বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানে সেবিকা ও তাঁর সহকারী হিসেবে আটজন কর্মচারী রয়েছেন। শহরের কেন্দ্রস্থলে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়। এ ছাড়া অনেক দিন ধরে ৫ টাকার চলও উঠে গেছে। ৫ টাকা লেনদেনেও ঝামেলা বেশ। এসব বিবেচনায় তিনি ফি বাড়িয়েছিলেন।

ফি না দিলেও রোগী দেখেন এবায়দুল্লাহ। কিন্তু কর্মচারীদের বেতন, খরচাপাতি দেন কীভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাতে গোনা কয়েকটা রোগনির্ণয়ের যন্ত্রপাতি আছে তাঁর এখানে। ইসিজির ব্যবস্থাও আছে। রোগীরা চাইলে নামমাত্র মূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে পারেন। এখান থেকে আসা টাকার পুরোটাই তিনি কর্মীদের পেছনে ব্যয় করেন। নিজে কিছু নেন না।

চেম্বারে একবেলা

এবায়দুল্লাহর চেম্বার দেখতে ১ নভেম্বর দুপুর ১২টার দিকে এই প্রতিবেদক হাজির হন নবাব ক্লিনিকে। ১৫-১৬ জন রোগী বসে ছিলেন। হাসিমুখে রোগীদের সঙ্গে কথা বলছেন এবায়দুল্লাহ। কারও কারও বাড়ির খোঁজ নিচ্ছেন। ব্যবস্থাপত্র লেখার পর একজন নার্স রোগীদের সেটি বুঝিয়ে দেন। রোগীরা টেবিলের ওপর ১০ টাকা করে রেখে চলে যান।

কয়েকজন রোগী দেখার পর এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার ফুরসত পান এবায়দুল্লাহ। শুরুতেই বলেন, ‘এখন সবাই আমাকে গরিবের ডাক্তার বলে। ১০ টাকার ডাক্তার বলে। সকাল থেকে ৩০ জন রোগী দেখা হয়ে গেছে।’

নবাব ক্লিনিকে কথা হয় আলীপুর এলাকার আমেনা বেগমের সঙ্গে। তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। তাঁর ১০ বছরের ছেলে রহমত আলীকে নিয়ে এসেছিলেন। পড়ে গিয়ে সপ্তাহখানেক আগে পায়ে ব্যথা পেয়েছিল ছেলেটা। আমেনা বলেন, ‘হাসপাতালে গেলে ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হয়। তারপর ডাক্তার কখন আসবে, তার ঠিক নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। ওর চেয়ে এই ডাক্তারই আমাগো জন্যি ভালো।’

শহরের মুনজিতপুর এলাকার কাঠমিস্ত্রি মনোয়ার হোসেন সর্দি, কাশি ও জ্বর নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ৩০ বছর ধরে তাঁর পরিবারের সদস্যরা এখান থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ৫০০-৬০০ টাকা ফি দিয়ে চিকিৎসক দেখানোর সামর্থ্য তাঁদের নেই। তাই এখানে আসা।

ভবিষ্যতে আর কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে চিকিৎসক এবায়দুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, নতুন কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে যে কদিন বেঁচে আছেন, সুস্থ থাকতে চান। সুস্থ থেকে গরিব-মেহনতি মানুষের চিকিৎসা দিতে চান।Ñএটাই তাঁর একমাত্র ইচ্ছা।