রাজশাহীতে কলেজে ঢুকে নারী শিক্ষককে মারধর করা বিএনপি কর্মী দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও
রাজশাহীতে গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় এক মৎস্য ব্যবসায়ী ও বিএনপি কর্মী দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি কলেজে ঢুকে একজন নারী শিক্ষককে জুতাপেটা করেছেন। এই বিএনপি কর্মীর নাম মো. শাহাদ আলী। তাঁর বাড়ি উপজেলার রসুলপুর গ্রামে। সাত বছর আগে একটি মামলায় আদালতের রায়ে তিনি দণ্ড পান। গত ৯ মার্চ আদালত তাঁর নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
এই পরোয়ানা মাথায় নিয়েই কলেজে ঢুকে পরিদর্শক আলিয়া খাতুনকে মারধর করেন শাহাদ আলী। আলিয়া খাতুনও ওই বিএনপি কর্মীকে চড় দিয়েছেন। এ জন্য গতকাল রোববার তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, জেলার পবা উপজেলার কালুপাড়া গ্রামে অবস্থিত যমুনা সিডস প্রাইভেট লিমিটেডের বিপণন ব্যবস্থাপক মো. নয়মুল ইসলাম ২০১৩ সালের ২০ মে শাহাদ আলীর বিরুদ্ধে রাজশাহীর রাজপাড়া থানা আমলি আদালতে একটি মামলা করেন।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, যমুনা সিডস প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ৫০ লাখ ৬৩ হাজার ১৮২ টাকা দেনার বিপরীতে শাহাদ আলী ইসলামী ব্যাংকের পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর শাখার একটি চেক দিয়েছিলেন। চেকের বিপরীতে টাকা না থাকায় ব্যাংক চেকটি প্রত্যাখ্যান করে। এ ঘটনার পর মো. নয়মুল ইসলাম বাদী হয়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মামলাটি করেন। পরে মামলাটি বিচারের জন্য রাজশাহীর অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ-১ আদালতে পাঠানো হয়। আদালত ২০১৯ সালের ২২ জুলাই আসামি শাহাদ আলীকে এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেন। হাইকোর্ট তাঁর আপিল নামঞ্জুর করে ২০২৫ সালের ১০ জুলাই মামলাটি নিম্ন আদালতে ফেরত পাঠান। হাইকোর্টের আদেশে চার মাসের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়। আসামি শাহাদ আলী আর আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি। টাকাও পরিশোধ করেননি। শেষ পর্যন্ত গত ৯ মার্চ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও এত দিন পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেনি। বরং এই গ্রেপ্তারি পরোনা নিয়েই তিনি এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।
কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাকও সেদিনের হামলায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য গতকাল রোববার রাজশাহী অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার পরিচালক মোহা. আসাদুজ্জামান দাওকান্দি সরকারি কলেজে যান। তিনি কলেজের অধ্যক্ষকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার বিবরণ দাখিল করতে বলেন এবং প্রদর্শক আলিয়া খাতুনকে বরখাস্ত করার নির্দেশ দেন। তিনি একই সঙ্গে আলিয়া খাতুনকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর লিখিত বক্তব্য দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। ঘটনাটি তদন্তের জন্য দুর্গাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।
জবাব দিতে গতকাল রোববার পরিচালকের কার্যালয়ে এসেছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক। তাঁর কপালে আঘাতের ক্ষত দেখা যায়। ঘটনার দিন বিএনপি কর্মী শাহাদ আলীর তাঁর কার্যালয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, শাহাদ আলী কলেজের একটি পুকুর চাষ করেন। কিন্তু তাঁর টাকা ঠিকমতো দেন না। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তাঁকে ডাকা হয়েছিল। তিনি এসে কলেজের প্রদর্শক আলিয়ার সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পা থেকে জুতা খুলে আলিয়া খাতুনকে পেটান। অধ্যক্ষ বলেন, সেখানকার পরিবেশ অত্যন্ত খারাপ। একটা কলেজের কার্যালয়ে এসে স্থানীয় লোকজন এ রকম আচরণ করতে পারেন—এটা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। তিনি হামলার ঘটনায় থানায় একটা সাধারণ ডায়েরি করেছেন। এ ছাড়া পুলিশ সুপার, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার, মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। মামলা করেননি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলা করে সেখানে টিকে থাকার পরিবেশ নেই।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পঞ্চনন্দ সরকার বলেন, কলেজের অধ্যক্ষ যেভাবে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে সেটা জিডি হয় না। এটাকে মামলা হিসেবে গণ্য করতে হবে। কিন্তু তিনি মামলা করবেন না। শাহাদ আলীর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার বিষয়ে তিনি বলেন, পুলিশ তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। পেলেই গ্রেপ্তার করবে।