নোয়াখালীতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর কার্যালয় দ্বিতীয় দিন ঘেরাও, দপ্তরে বসেননি নির্বাহী প্রকৌশলী

নোয়াখালী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর কার্যালয় দ্বিতীয় দিনের মতো ঘেরাও করেন ঠিকাদারেরা। আজ দুৃপুরে তোলাছবি: প্রথম আলো

নোয়াখালী জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় দ্বিতীয় দিনের মতো ঘেরাও করেছেন ঠিকাদার ও তাঁদের সহযোগীরা। আজ সোমবার বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত ওই ঘেরাও চলে। তবে এ সময় নির্বাহী প্রকৌশলী তাঁর দপ্তরে ছিলেন না। তিনি ঠিকাদারেরা আসার আগেই কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যান বলে জানা গেছে।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, পানি সরবরাহ ও টিউবওয়েল স্থাপনের কাজে ব্যবহৃত কয়েক কোটি টাকার মালামাল ‘গোপনে’ নামমাত্র মূল্যে নিলাম দিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়। এর প্রতিবাদ জানতেই তাঁরা কর্মসূচি পালন করছেন। পাশাপাশি আদায় করা অতিরিক্ত কমিশনের (পিসি) টাকা ফেরত দেওয়ার দাবিও জানান ঠিকাদারেরা।

ঠিকাদার ও তাঁদের লোকজনের ঘেরাও কর্মসূচির কারণে আজ কার্যালয়টিতে কার্যত কোনো দাপ্তরিক কাজ হয়নি বলে কার্যালয়ের কর্মচারীরা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন। আজ বেলা তিনটার দিকে সরেজমিনে কার্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরের দরজায় তালা ঝুলছে। অন্যান্য কক্ষে কর্মচারীদের দেখা গেলেও তাঁদের সবারই চোখেমুখে একধরনের ভীতি ও আতঙ্ক ছিল। এই সময় সুধারাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থল ঘুরে যায়। ওসি উপস্থিত লোকজনের কাছ থেকে সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নেন।

কার্যালয়ের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম সকালে একবার দপ্তরে বসেছিলেন। কিছুক্ষণ পরই তিনি সাইট দেখার কথা বলে কার্যালয় থেকে বেরিয়ে গেছেন। তবে কোথায় গেছেন, কাউকে বলে যাননি।

জেলা বিএনপির সদস্য ও ঠিকাদার আবদুল মোতালেব ওরফে আপেল প্রথম আলোকে বলেন, আগের দিন দেওয়া কথা অনুযায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের আজ অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া নিলামের কার্যাদেশ লিখিতভাবে বাতিল এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে নেওয়া কমিশনের অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেওয়ার কথা। কিন্তু আজ সকালে তিনি তাঁর দপ্তরেই বসেননি। দপ্তরে না বসে তিনি অজ্ঞাত স্থানে চলে যান। ঠিকাদারেরা তাঁকে বারবার ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরেননি।

আবদুল মোতালেবের অভিযোগ, এই প্রকৌশলী নোয়াখালীতে যোগদানের পর থেকে কার্যালয়টিকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। কাজ দেওয়ার নামে ঠিকাদারদের কাছে থেকে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায় করেছেন। এসব করে গত কয়েক মাসেই প্রায় পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাঁকে কমিশনের টাকা দিতে গিয়ে ঠিকাদারেরা এখন সর্বস্বান্ত। তাই তাঁরা কমিশনের টাকা ফেরত চাচ্ছেন। কারণ, উচ্চ হারে কমিশন দেওয়ার কারণে কাজ করলে বেশির ভাগ ঠিকাদারই লোকসানের মুখে পড়বেন।

ঠিকাদারদের দ্বিতীয় দিনের মতো কার্যালয় ঘেরাও করার বিষয়ে জানার জন্য সোমবার দুপুরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও ফোন ধরেননি নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম। পরে বিকেল চারটার দিকে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে লেখেন, ‘তিনি জরুরি কাজে ব্যস্ত আছেন। আগামীকাল দেখা হবে।’

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি নোয়াখালী সরকারি কলেজসংলগ্ন গুদামে থাকা পানি সরবরাহ ও টিউবওয়েল স্থাপনের কাজে ব্যবহৃত কয়েক কোটি টাকার মালামাল ‘গোপনে’ নামমাত্র মূল্যে নিলামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। নিলামে ডাক পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন গুদাম থেকে ওই সব মালামাল সরিয়ে নেওয়া শুরু করলে বিষয়টি জানাজানি হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হন অন্য ঠিকাদারেরা। তাঁরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, সাত-আট কোটি টাকার মালামাল ২০ লাখ টাকায় সাজানো নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এরপর গতকাল রোববার কার্যালয়ে গিয়ে নিলাম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ঠিকাদারেরা। তাঁরা নির্বাহী প্রকৌশলীকে ছয় ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন। একপর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নিলামের কার্যাদেশ বাতিল করতে রাজি হন।

রোববার অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছিলেন, গুদামে থাকা মালামাল তিনি নিলাম করেননি। সেটি ঢাকা থেকে করা হয়েছে। কিন্তু ঠিকাদারেরা তাঁর কার্যালয় ঘেরাও ও তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে তাঁদের দাবি অনুযায়ী ওই নিলামের কার্যাদেশ বাতিলের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে কয়েক কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন নির্বাহী প্রকৌশলী। তিনি দাবি করেন, যেসব ঠিকাদার কাজ পাননি, তাঁরা ওই সব অভিযোগ করছেন।