পোস্টাল ভোট
‘ভাবিনি বিদেশে বসে ভোট দিতে পারব’
চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে মোট অনুমোদিত পোস্টাল ভোটার ৯৪ হাজার ৯৭৯।
দেশের ভেতরে ভোটার ২৬ হাজার ৪৮২।
বিদেশে অবস্থানকারী ভোটার ৬৮ হাজার ৪৯৭।
২১ জানুয়ারি থেকে ভোট দিতে পারছেন তাঁরা।
‘আগের নির্বাচনে সশরীর ভোট দিয়েছিলাম। এরপর দেশের বাইরে চলে আসি। বাইরে আসার পর ভোট দিতে পারব ভাবিনি। এবার প্রথমবারের মতো পোস্টাল ভোট দিলাম। কোনো ঝামেলা ছাড়াই গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট দিয়েছি। খামের ভেতরে আর অ্যাপে সব নির্দেশনা দেওয়া ছিল। ভাবিনি বিদেশে বসে ভোট দিতে পারব।’
কথাগুলো আকবর হোসেনের। উচ্চশিক্ষার জন্য বর্তমানে জার্মানির ডিভুর্গ শহরে অবস্থান করছেন তিনি। সেখানে বসেই চট্টগ্রাম–১০ (ডবলমুরিং, খুলশী ও পাহাড়তলী) আসনের পছন্দের প্রার্থীকে ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন তিনি। গণভোটের ব্যালটেও ভোট দিয়েছেন আকবর হোসেন। ২১ জানুয়ারি নিজের ফেসবুক আইডিতে ভোট দেওয়ার বিষয়টি জানান তিনি।
‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধন করা হয়েছে। নিবন্ধনের পর তাঁদের ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে ব্যালট।
বাংলাদেশ সময় ২৪ জানুয়ারি রাত আটটার দিকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথা হয় আকবর হোসেনের সঙ্গে। বিদেশের মাটিতে বসে দেশে ভোট দিতে পেরে আনন্দিত তিনি। আকবর হোসেন বলেন, ‘সব নির্দেশনা দেওয়াই ছিল। অ্যাপের মাধ্যমে যাচাই–বাছাই হওয়ায় আমার ভোট অন্য কেউ দেওয়ার সুযোগ নেই। নির্দেশনা মেনে রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর আবার ব্যালট পাঠিয়ে দিয়েছি।’
আকবর হোসেন একা নন, তাঁর মতো আরও ৬৮ হাজার ভোটার এবার বিদেশে বসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধন করা হয়েছে।
নিবন্ধনের পর তাঁদের ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে ব্যালট। ২১ জানুয়ারি থেকে ভোট দিতে পারছেন তাঁরা।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, মূলত দুই ধরনের পোস্টাল ভোটার রয়েছেন এবার। একটি হলো দেশের বাইরে অবস্থানরত বা আউট অব কান্ট্রি ভোটিং (ওসিভি)। অন্যটি ইন কান্ট্রি পোস্টাল ভোটিং (আইসিপিভি)। আইসিপিভি ভোটার হলেন দেশে অবস্থানরত সরকারি চাকরিজীবী, নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, আনসার ও ভিডিপি ও কারাবন্দী ভোটার।
পোস্টাল ভোটের ওয়েবসাইটে ভোটারদের আসন ও জেলাভিত্তিক তথ্য দেওয়া হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে মোট অনুমোদিত পোস্টাল ভোটার ৯৪ হাজার ৯৭৯। এর মধ্যে দেশের ভেতরে ভোটার ২৬ হাজার ৪৮২। বিদেশে অবস্থানকারী ভোটার ৬৮ হাজার ৪৯৭। সব মিলিয়ে পোস্টাল ভোটারদের মধ্যে ৮৬ হাজার ৪১৩ পুরুষ ও ৮ হাজার ৮৮৩ নারী। এর মধ্যে অনুমোদিত হয়নি ৩১৮ জনের নিবন্ধন।
নির্বাচন কমিশন ও ভোটারদের সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে জাতীয় পরিচয়পত্র, নাম ও মুঠোফোন নম্বর দিয়ে নির্ধারিত অ্যাপে নিবন্ধন করতে হয়। এরপর সেখানে লাইভ ফটো ভেরিফিকেশন করা হয়। নিবন্ধনের ২০ থেকে ২২ দিন পর হাতে আসে ব্যালট। এরপর বিনা খরচেই সেটি আবার দেশে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। তবে বেশ কয়েকজন ভোটারের ভাষ্য, এটি পাঠাতে টাকা চাওয়া হচ্ছে।
কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সারা দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ পোস্টাল ভোটার ফেনী–৩ (দাগনভূঞা ও সোনাগাজী) আসনে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পোস্টাল ভোটার চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া) আসনে। এ আসনে অনুমোদিত পোস্টাল ভোটার ১৪ হাজার ২৭৪। এর মধ্যে আইসিপিভি ভোটার ১ হাজার ৮২৯। সে হিসাবে অনুমোদিত ওসিভি ১২ হাজার ৪৪৫ জন।
দেড় বছর আগে পরিবার নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন চট্টগ্রাম–১৫ আসনের ভোটার আশরাফুল ইসলাম। বর্তমানে কানাডার অটোয়া শহরে অবস্থান করছেন। ইতিমধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়ে তিনি সেটি রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি ও তাঁর বড় ভাই—দুজনই পোস্টাল ভোটে ভোট দিয়েছেন।
ফেসবুক মেসেঞ্জারে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের বাইরে এসেও ভোট দিতে পারব, এটি আসলে আনন্দের। এখানে নির্বাচন কমিশন এসেছিল। আমাদের আশপাশে অনেক বাংলাদেশি রয়েছেন। তাঁরাও ভোট দিয়েছেন। তবে অনেকে এখনো ব্যালট পাননি বলে শুনেছি। আমাদের বলা হয়েছিল, ২৫ জানুয়ারির আগে ভোট দিতে। যাঁদের ব্যালট আসেনি, তাঁরা দুশ্চিন্তায় আছেন যে আদৌ তাঁদের ভোট গণনা হবে কি না।’
অধিকাংশ প্রবাসী ভোটার নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলেও এর মধ্যে কয়েকজন অভিযোগ জানিয়েছেন, তাঁরা ভোট দেওয়ার সময় প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছেন। ভোটাররা জানান, বিভিন্ন দেশে ভোটের ব্যালট ফেরত পাঠানো খাম পোস্ট করতে গেলে টাকা চাওয়া হচ্ছে। যদিও নির্বাচন কমিশন বলেছিল, এতে টাকা লাগবে না। তবে দেশগুলোর পোস্ট অফিসগুলোকে সেটি সরাসরি জানানো হয়নি।
কানাডাপ্রবাসী আশরাফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুরুতে এখানকার অনেকে যখন পোস্ট করতে গিয়েছিলেন, তখন তাঁদের কাছে তিন ডলারের বেশি চাওয়া হয়েছিল। অনেকেই অভিযোগ করেছেন। পরে আমার কাছে চায়নি আর। অস্ট্রেলিয়ায়ও একই বিষয় হয়েছে বলে শুনেছি। আবার আমার ব্যালট বাসার মেইল বক্সে এলেও ভাইয়েরটা এসেছে পোস্ট অফিসে। অ্যাপেও কিছু সমস্যা আছে।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ও নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রামের ১০টি আসনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাকে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। এখনো পোস্টাল ভোটের ব্যালট জেলা ট্রেজারিতে এসে পৌঁছায়নি।’