সুনামগঞ্জে বালু লুটের আশঙ্কা, জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জেলা প্রশাসনের
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন নদ–নদী ও মহালগুলোতে বালু লুটের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বালু লুট প্রতিরোধে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া। আজ মঙ্গলবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের ফেসবুক পেজে পোস্ট করে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।
সুনামগঞ্জের বড় পাঁচটি বালুমহালের মধ্যে তিনটি চলতি বছর এখনো ইজারা হয়নি। গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর এসব বালুমহাল থেকে বালু ও পাথর লুট শুরু হয়। প্রথম দিকে পুলিশ ও প্রশাসন ছিল নির্বিকার। পরে এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে প্রশাসন ও পুলিশ কঠোর হয়। তদন্ত করে কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। বদলি করা হয় সুনামগঞ্জের তৎকালীন পুলিশ সুপার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খানকে।
কিন্তু এখনো নানাভাবে চলতি, যাদুকাটা নদীসহ অন্যান্য নদী ও মহাল থেকে বালু ও পাথর তোলা হচ্ছে। গতকাল সোমবার সদর উপজেলার জয়নগর এলাকা থেকে ১০ লাখ ঘনফুট বালু জব্দ করে প্রশাসন। একই দিন দোয়ারাবাজার উপজেলার খাসিয়ামারা নদীতে অভিযান চালিয়ে বালুবোঝাই তিনটি বাল্কহেড জব্দ ও একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাহিরপুর উপজেলার চানপুর এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে কয়েকজনকে ধরে পুলিশে দেন এলাকাবাসী।
অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহন লুটের পর্যায়ে চলে যেতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে ফেসবুকে সতর্কতামূলক পোস্ট দেওয়া হয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, ‘সম্প্রতি সিলেটের সাদাপাথর লুটের ঘটনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সুনামগঞ্জে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবহনের চেষ্টা করছে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দেশপ্রেমিক সাহসী জনতাকে অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহনের কোনো ঘটনা ঘটলে তার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে এবং এ ঘটনা সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুততম সময়ে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মামলা-সংক্রান্ত জটিলতায় ২০১৮ সাল থেকে সুনামগঞ্জের চলতি নদীর ধোপাজান বালুমহাল ইজারা হয়নি। এখন মামলা জটিলতা না থাকলেও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর কোনো প্রভাব আছে কি না, সে ব্যাপারে প্রতিবেদন দিতে নদী রক্ষা কমিশনকে একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পরই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ইজারা না হলেও নানাভাবে চলতি নদী থেকে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বালু ও পাথর উত্তোলন করা হয়। প্রশাসন অবৈধভাবে তোলা এসব বালু ও পাথর জব্দ করে নিলামে দেয়। তবে এই নিলাম নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। অভিযোগ আছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করেই এসব বালু ও পাথর তোলা হয়।
জেলার সবচেয়ে বড় বালুমহাল তাহিরপুরের যাদুকাটা নদীতে। সেখানে দুটি বালুমহাল রয়েছে। এবার দুটি বালুমহাল ১০৮ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু এ নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা হওয়ায় প্রশাসন ইজারাদারকে বালুমহাল বুঝিয়ে দিতে পারেনি। এরপর চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল যাদুকাটাসহ ইজারা না হওয়া জেলার পাঁচটি মহাল থেকে বালু উত্তোলন ও পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রশাসন। পরে সুনামগঞ্জে খাসিয়ামারা ও মরাচেলা বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ১৯ আগস্ট যাদুকাটা নিয়ে রিটের শুনানি শেষে ইজারাদারের অনুকূলে রায় হয়েছে। তবে রায়ের কপি এখনো জেলা প্রশাসন পায়নি বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
সুনামগঞ্জ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বালু-পাথর লুট চাই না। সরকারিভাবে বালু পাথর ক্রয়-বিক্রয়কেন্দ্র চালু করে হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। পরিবেশ বিধ্বংসী বোমা মেশিন, শ্যালো মেশিন, ড্রেজার ও সেইভের সাহায্যে নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক ওবায়দুল হক বলেন, সুনামগঞ্জে বালুমহালগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। তাঁরা ইজারার বিপক্ষে নন। তবে ড্রেজার বা খননযন্ত্রে পরিবেশ বিধ্বংসী কাজের বিপক্ষে। শ্রমিকেরা যাতে হাতে বালু তুলে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
এক কোটি ২১ লাখ ঘনফুট বালু তোলার অনুমতি
সুনামগঞ্জে আট বছর ধরে ইজারা বন্ধ থাকা চলতি নদীর ধোপাজান পাথরমিশ্রিত বালুমহাল থেকে ‘লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ২১ লাখ ২০ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা এই নদীর অবস্থান সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলাজুড়ে। নদীর তিনটি মৌজা থেকে এই বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়। এ নিয়ে নানা মহলে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর সিলেট অঞ্চলের উপপরিচালক শরিফ ইসলাম বালু উত্তোলনের অনুমতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই বালু ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজে ব্যবহৃত হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) কাছে আবেদন করেছিল। সওজ আবেদন করে বিআইডব্লিউটিএর কাছে। পরে বিআইডব্লিউটিএ নিয়ম মোতাবেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জনস্বার্থে এখান থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া ধোপাজান নদ থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতির বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি বালু লুট বন্ধের বিষয়ে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি এটি যাতে না হয়। কোথাও ছোটখাটো অভিযোগ বা খবর পেলেই আমরা অভিযান চালাচ্ছি। এ বিষয়ে স্থানীয় জনগণকে সহযোগিতার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।’