বিরল ‘গোলাপি’ হাতিটি এখন শুধুই স্মৃতি
প্রায় ১০ মাস হয়ে গেছে ‘গোলাপি’ নেই। তবু কাপ্তাই হ্রদের পানিতে নিথর হস্তীশাবকটিকে তুলে আনার জন্য তার মায়ের প্রাণান্তকর চেষ্টার সেই দৃশ্য এখনো মনে পড়ে। পানিতে পড়ে আছে ছোট্ট ‘গোলাপি’। মা তাকে ছেড়ে যাচ্ছে না। কখনো পানিতে নেমে শুঁড় দিয়ে ঠেলছে, কখনো পা ধরে টেনে তুলতে চাইছে। এক জায়গায় না পেরে নিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের অন্য পাশে। ডাঙায় দাঁড়িয়ে আবার চেষ্টা করছে। কিন্তু ছোট্ট শরীরটি আর উঠছে না। কোনো সাড়াও নেই।
অস্থির হয়ে উঠছে মা হাতিটি। কান ঝাঁকাচ্ছে, মাথা নাড়ছে, কখনো গাছের ডাল ভাঙছে। আবার ফিরে যাচ্ছে পানিতে ভাসতে থাকা শাবকের কাছে। যে শাবক কয়েক মাস ধরে তার পেটের নিচে আশ্রয় নিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরেছে, সেই ‘গোলাপি’ আর উঠছে না। দিন গড়িয়েছে। তবু শাবককে ছেড়ে যায়নি মা।
‘গোলাপি’ নামটি শাবকটির মা দেয়নি। দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী গবেষক এম এ আজিজ। রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ে বিরল রঙের শাবকটিকে প্রথম দেখেছিলেন তিনি। তখন জীবন সবে শুরু। কয়েক মাসের মধ্যেই কাপ্তাই হ্রদের পানিতে নিথর হয়ে পড়ে সেই গোলাপি। গোলাপির জন্ম, বেড়ে ওঠা ও মৃত্যুর এই গল্প এম এ আজিজ লিখেছেন তাঁর ‘বিপন্ন হাতির কথা’ বইয়ে।
প্রথম দেখা গোলাপির সঙ্গে
দিনটি ছিল ২০২৫ সালের ১৫ জুন। রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একদল বন্য হাতি সাঁতরে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাচ্ছিল। সেই দৃশ্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দলের একটি শাবকের গায়ে হালকা গোলাপি আভা নজরে পড়ে। পরে বন বিভাগের কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীদের সহযোগিতায় বরকলের পাহাড়ি এলাকার একটি টিলায় হাতির দলটিকে খুঁজে পাওয়া যায়। দলে ছিল আটটি হাতি। পাঁচটি পূর্ণবয়স্ক, একটি কিশোর ও দুটি শাবক। সবচেয়ে ছোট শাবকটির দিকেই চোখ আটকে যায় সবার।
দিনটি ছিল ২০২৫ সালের ১৫ জুন। রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একদল বন্য হাতি সাঁতরে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাচ্ছিল। সেই দৃশ্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দলের একটি শাবকের গায়ে হালকা গোলাপি আভা নজরে পড়ে। পরে বন বিভাগের কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীদের সহযোগিতায় বরকলের পাহাড়ি এলাকার একটি টিলায় হাতির দলটিকে খুঁজে পাওয়া যায়।
সাধারণত হাতির শাবকের শরীরে কালো লোম থাকায় গায়ের রং বেশ কালচে দেখায়। কিন্তু এই শাবক ছিল ব্যতিক্রম। শরীরে বাদামি লোম, গায়ে হালকা গোলাপি আভা। চোখও হালকা গোলাপি। চোখের পাতার ওপর ছিল বাদামি লোম। এটি ছিল পুরুষ শাবক। অধ্যাপক এম এ আজিজ নাম দিলেন—গোলাপি।
সেই সময়ের স্মৃতিচারণা করে এম এ আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, মায়ের কাছ থেকে খুব একটা দূরে যেত না গোলাপি। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই মায়ের দুই পায়ের মাঝখানে ঢুকে পড়ত। দলে কাছাকাছি বয়সী আরেকটি শাবক ছিল। দুটিকে কখনো গা ঘেঁষে হাঁটতে, কখনো খুনসুটি করতে দেখা যেত। এত ছোট বয়সেই কাপ্তাই হ্রদও পাড়ি দিত গোলাপি। মা ও দলের অন্য হাতিদের সঙ্গে সাঁতরে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যেত।
গোলাপি কেন এত বিরল
গোলাপি আলাদা কোনো প্রজাতির হাতি ছিল না। ছিল এশীয় হাতিরই একটি শাবক। শরীরের রঙের ভিন্নতার কারণেই অন্য হাতিদের চেয়ে তাকে আলাদা দেখাত। এম এ আজিজ তাঁর ‘বিপন্ন হাতির কথা’ বইয়ে লিখেছেন, এ ধরনের হাতিকে সাধারণভাবে সাদা হাতি বা অ্যালবিনো হাতি বলা হয়। তাঁর উল্লেখ করা একটি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ হাজার শাবকের মধ্যে একটি এমন রং নিয়ে জন্মাতে পারে। বুনো পরিবেশে এমন হাতির দেখা পাওয়া বিরল।
উঁচু পাহাড় থেকে পড়ে গোলাপির মৃত্যু হয়েছিল। মৃত্যুর সময় শাবকটির বয়স হয়েছিল প্রায় ৯ মাস। দেশে দেখা এটিই ছিল প্রথম গোলাপি রঙের বন্য হাতি।মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল সরকার, বন সংরক্ষক, রাঙামাটি
কিন্তু যে রং গোলাপিকে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল, প্রকৃতিতে সেটিই বাড়তি ঝুঁকির কারণ হতে পারে। অ্যালবিনো প্রাণীর শরীরে মেলানিনের ঘাটতি থাকায় সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বক ও চোখের স্বাভাবিক সুরক্ষা কমে যায়। সহজে রোদে ত্বক পুড়ে যাওয়া, চোখের সমস্যাসহ বিভিন্ন শারীরিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে গোলাপির সামনে শুধু শরীরের রংজনিত ঝুঁকি ছিল না। তার চেয়ে বড় সংকট ছিল—থাকার জায়গা।
গোলাপিদের দলটি যে এলাকায় থাকত, সেখানে চারদিকে কাপ্তাই হ্রদের পানি। পানির মধ্যে ছড়িয়ে আছে ছোট-বড় টিলা। অনেক টিলাই ব্যক্তিমালিকানাধীন। কোথাও লিচু, কোথাও আম, আমলকী কিংবা কাঁঠালের বাগান। আশপাশে হাতির জন্য পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক বনও ছিল না। ফলে আটটি হাতির দলটির সামনে খাবার ও নিরাপদ চলাচলের জায়গা—দুই সংকটই ছিল। খাবারের সন্ধানে মানুষের বাগান ও ফসলের জমির কাছে যেতে হতো তাদের। সেখানেই মুখোমুখি হতো মানুষ ও হাতি। এ সংকট অবশ্য গোলাপির জন্মের বহু আগের।
‘বিপন্ন হাতির কথা’ বইয়ে এম এ আজিজ লিখেছেন, ষাটের দশকে কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ নির্মাণের পর বিস্তীর্ণ এলাকা কাপ্তাই হ্রদের পানিতে তলিয়ে যায়। বদলে যায় হাতির বিচরণভূমিও। পরে অবশিষ্ট পাহাড়ি এলাকায় মানুষের বসতি, বাগান ও চাষাবাদ বিস্তৃত হয়েছে।
বর্ষায় সংকট আরও বাড়ে। হ্রদের পানি বাড়লে হাতিদের চলাচলের জায়গা কমে যায়। খাবারের জন্য এক টিলা থেকে আরেক টিলায় যেতে হয়। মাঝখানে পানি। ছোট্ট গোলাপিকেও তাই খুব অল্প বয়সেই সাঁতার শিখতে হয়েছিল। মানুষের ফসলের কাছে গেলেই আবার শুরু হতো তাড়ানো।
এম এ আজিজ লিখেছেন, স্থানীয় লোকজন হাতি তাড়াতে গাছের ডাল, মাটির ঢেলা, কাঠের টুকরা ও আগুন ব্যবহার করতেন। এমনকি ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতলে পানি ভরে হাতির দিকে ছুড়ে মারা হতো। নৌকা নিয়ে হ্রদে নেমেও টিলায় থাকা হাতির দিকে পানিভর্তি বোতল ছুড়তে দেখেছেন তিনি। তখন ছোট গোলাপি ও কাছাকাছি বয়সী অন্য শাবকটি মা হাতিদের পেটের নিচে আশ্রয় নিত। মানুষের অভিযোগ, হাতি তাদের ফসল নষ্ট করে।
তারপর একদিন গোলাপি নেই
প্রথম দেখার মাত্র কয়েক মাস পর। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর রাতে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে হাতির একটি শাবকের নিথর দেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে খবর যায় বন বিভাগের কাছে। প্রথমে নিশ্চিত হওয়া যায়নি সেটি কোন শাবক। পরে জানা গেল, মৃত শাবকটিই গোলাপি। যে শাবককে কয়েক মাস আগে একই হ্রদ সাঁতরে পার হতে দেখা গিয়েছিল, এবার সেই হ্রদের পানিতেই ভাসছিল তার দেহ।
রাঙামাটির বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল সরকার প্রথম আলোকে বলেন, উঁচু পাহাড় থেকে পড়ে গোলাপির মৃত্যু হয়েছিল। মৃত্যুর সময় শাবকটির বয়স হয়েছিল প্রায় ৯ মাস। দেশে দেখা এটিই ছিল প্রথম গোলাপি রঙের বন্য হাতি।
গোলাপির মৃত্যুর পরের দৃশ্যটি ছিল আরও কঠিন। মা হাতিটি শাবককে ছেড়ে যেতে চাইছিল না। পানিতে নেমে বারবার শুঁড় ও পা দিয়ে দেহটি ঠেলে তোলার চেষ্টা করছিল। এক জায়গায় না পেরে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছিল। ডাঙা থেকে টেনে তুলতে চাইছিল। কিন্তু গভীর পানি থেকে আর তুলে আনতে পারেনি। মা তবু চেষ্টা থামায়নি।
অধ্যাপক এম এ আজিজ জানালেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এমন রঙের আর কোনো বন্য হাতি দেখা যায়নি। এশিয়ায় বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় এমন একটি হাতি বেঁচে রয়েছে। খুব অল্প সময়ের জন্যই তাকে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সেই কয়েক মাসেই গোলাপি হয়ে উঠেছিল রাঙামাটির পাহাড়ের এক বিরল উপস্থিতি।