নিঃশব্দ দুপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনের প্রধান ফটক পেরোতেই সামনে এল সরু পাকা পথ। দুই পাশে উঁচু গাছের ছায়া ফেলে মাটিতে নকশা এঁকে দেয় সূর্যের আলো। শহরের কোলাহল ছেড়ে যেন অন্য এক জগতে প্রবেশের আমন্ত্রণ। কিন্তু একটু ভেতরে ঢুকতেই বদলাতে শুরু করে ধারণা। অপরূপ এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে অবহেলা আর অযত্নের করুণ চিত্র। পর্যাপ্ত লোকবল, বাজেট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখানকার জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার সময় ১৯৬৪ সালে বোটানিক্যাল গার্ডেনের যাত্রা শুরু। প্রায় ১৫ একর বিস্তৃত সবুজের ক্যানভাস ধীরে ধীরে রূপ নেয় উদ্ভিদবিজ্ঞানের এক জীবন্ত পাঠশালায়। দেশি-বিদেশি শত শত প্রজাতির উদ্ভিদের সমাহার, বিরল গাছের সংরক্ষণ, সমৃদ্ধ জিনপুল, মৌসুমি ফুলের রঙিন উপস্থিতি যে কাউকে টানে।
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ব্রোশিওরের তথ্যমতে, বর্তমানে গার্ডেনে প্রায় ৭৮টি পরিবারের ৬০০ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। গাছের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ হাজার। পাশাপাশি প্রায় ৩০ প্রজাতির বাঁশ, ১৭ ধরনের মসলাজাতীয় উদ্ভিদ ও প্রায় ৪০ প্রজাতির লেবুজাতীয় ফলের জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ করা আছে। এখানে প্রকৃতি শুধু দৃশ্য নয়; বরং গবেষণার উপাদান, শিক্ষার মাধ্যম ও জীববৈচিত্র্যের এক উন্মুক্ত ভান্ডার।
তবে ব্রোশিওরের বর্ণিল বর্ণনার বাইরে আরেকটি ছবি চোখে পড়ে। গার্ডেনের সম্মুখভাগ এখনো ব্রোশিওরের সৌন্দর্যের আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু ভেতরের অবহেলা আর অযত্নের ছাপ স্পষ্ট। অনেক জায়গা প্রায় জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। গার্ডেনের বেশির ভাগ গাছে নেমপ্লেট নেই। এমনকি মালিরাও অনেক গাছ ভালোভাবে চেনেন না। গাছগুলো চিনিয়ে দেওয়ার মতো অভিজ্ঞ লোক নেই বলে জানান মালিরা। ঘাস কাটার মেশিন থাকলেও তেল ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
গার্ডেনের মালিদের ভাষ্য, পর্যাপ্ত লোকবল, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করছেন। আগে ১২ জন মালি থাকলেও এখন মাত্র দুজন মালি ও একজন মাস্টাররোল কর্মচারী দিয়ে বিশাল এলাকা পরিচর্যা করতে হচ্ছে।
মালি আনারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত বড় জায়গায় আমরা তিনজন কাজ করি। এক বিঘাও ঠিকভাবে পরিষ্কার করা যায় না।’
মালি খোরশেদ আলম বলেন, ‘মেশিন আছে; কিন্তু তেল নাই। তাই চালানো যায় না। প্রায় এক বছর ধরে একটা মেশিন পড়ে আছে, নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। সার্ভিসিংও ঠিকমতো হয় না। নতুন মেশিনও দেওয়া হয় না। মেশিন পাওয়ার পর দু–একবার তেল পেয়েছিলাম; কিন্তু বারবার বলেও আর তেল পাইনি।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গার্ডেন থেকে নিয়মিত বাঁশ, ডালপালা ও অন্যান্য সম্পদ চুরি হয়ে যাচ্ছে। প্রাচীর উঁচু করা বা ক্যামেরা বসানোর মতো প্রস্তাব দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে চুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার বলেন, কিছু দুষ্প্রাপ্য গাছ থাকলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি যেমন অ্যামাজন লিলি এখন আর টিকে নেই। নির্দিষ্ট কিছু গাছ নিয়েই সীমিতভাবে পড়াশোনা হয়। পাঁচ থেকে ছয় হাজার গাছ থাকলেও সব গাছ শিক্ষার্থীদের দেখানো হয় না। একটি গ্রিনহাউস সম্পূর্ণভাবে অন্য বিভাগের অধীনে আছে এবং সেখানে প্রবেশও সীমিত।
আরেক শিক্ষার্থী মিঠু রায় বলেন, বোটানিক্যাল গার্ডেনে মূলত গবেষণাভিত্তিক কাজ বেশি হলেও অনেক দুষ্প্রাপ্য প্ল্যান্ট পর্যাপ্তভাবে সংরক্ষিত নয়। কিছু গাছ অনলাইনে বা ছবি দেখে শিক্ষার্থীদের শিখতে হয়, সরাসরি পর্যাপ্ত নমুনা পাওয়া যায় না। যদিও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে বাস্তবায়ন হয়নি।
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাবরিনা নাজ বলেন, বোটানিক্যাল গার্ডেনের জন্য প্রশাসন কোনো বাজেট বরাদ্দ দেয় না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে বরাদ্দ পাওয়ার কথা থাকলেও সেটা তাঁরা পান না। ইচ্ছে থাকলেও তাঁরা নিজেরা কিছু করতে পারেন না। সীমানাপ্রাচীর নিচু ও একদিকে প্রাচীর না থাকায় দুষ্প্রাপ্য গাছ চুরি হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে অনেক নির্বিষ সাপ এখানে অবমুক্ত করেন। আবার আরেক দল এসে ধরে নিয়ে যায়। সব মিলিয়ে গার্ডেনের জীববৈচিত্র্য এখন ঝুঁকিতে আছে।
অধ্যাপক সাবরিনা আরও বলেন, ‘আমরা চাই সাধারণ মানুষকে এসব দেখাতে, বাচ্চারা-স্টুডেন্টরা গাছ চিনুক, ভালোবাসুক। কিন্তু পারছি কই? আমাদের বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে পদক্ষেপ নিলেও পারছি না। লোকবলের অভাবের কারণে চাইলেও আমরা এটা প্রদর্শনীর জন্য উন্মুক্ত করতে পারি না।’