দুটি বাছুর থেকে ১৪টি গরুর মালিক গৃহবধূ শাহীন আক্তার, করেছেন পাকা বাড়িও
মাত্র ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ২টি বাছুর দিয়ে খামার শুরু করেন গৃহবধূ শাহীন আক্তার। এখন তাঁর খামারে ১৪টি শাহিওয়াল জাতের গরু রয়েছে। বর্গা চাষি স্বামী বিদেশে গিয়েও ফিরে এসেছেন। ঋণের ভারে জর্জর ছিলেন। দুই বেলা খাবার জোটাতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু খামার করে সব ধারদেনা শোধ করেছেন শাহীন। পাকা বাড়ি করেছেন। চার সন্তাকে লেখাপড়াও করিয়েছেন। এখন এলাকায় সব নারীর অনুপ্রেরণা তিনি। তাঁর দেখাদেখি অনেক নারী গরু পালনে এগিয়ে এসেছেন।
২৫ বছর আগে দরিদ্র এক কৃষক পরিবারে বিয়ে হয়েছিল শাহীন আক্তারের (৪৩)। স্বামী ছিলেন বর্গা চাষি। তাঁদের কুঁড়েঘরে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। দুই বেলা ঠিকমতো খাবার জুটত না। এর মধ্যে একে একে জন্ম নেয় তিন কন্যাসন্তান। শাহীনের দুশ্চিন্তা তখন আরও বেড়ে যায়। প্রতিবেশী ও স্বজনদের কাছ থেকে ধার নিয়ে স্বামী আবু সুফিয়ানকে সৌদি আরবে পাঠান। সেখানে ঠিকমতো কাজ জুটছিল না। বেকার ছিলেন বেশির ভাগ সময়। পাঁচ বছর পরে বাধ্য হয়ে ২০০৯ সালে দেশে ফেরেন সুফিয়ান। একদিকে পাওনাদারদের চাপ, অন্যদিকে সংসারের ভরণপোষণ। কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না এই নারী।
২০১০ সালে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ২টি বাছুর কিনে পালন শুরু করেন শাহীন। তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন একটি মাঝারি আকারের খামার। এখন তিনি ১৪টি গরুর মালিক। ঘর সামলেই খামারে কাজ করেন। প্রতিবছর গরু বিক্রির টাকা দিয়ে নতুন করে বাছুর কেনেন। গরুর জন্য চাষ করেছেন উন্নত জাতের ঘাস ও পশুখাদ্য। এসবের পাশাপাশি তিন মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিতও করেছেন। পরিবারে এখন সচ্ছলতা এসেছে। তাঁর কুঁড়েঘর ভেঙে ২০১৯ তৈরি করেছেন একতলা পাকা বাড়ি।
শাহীন আক্তারের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের আকবরপাড়া এলাকায়। লোহাগাড়া উপজেলা সদর থেকে লোহাগাড়া সড়ক হয়ে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই আকবরপাড়া এলাকায় ডলু নদের ওপর বেইলি সেতু। সেতুটি পার হলে নদের পাড় বেয়ে দক্ষিণে ১৫০ মিটার গেলে শাহীন আক্তারের বাড়ি।
গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, পাকা বসতঘরটির সামনের অংশে আছে খামারটি। সেখানে ঘাস খাচ্ছিল ১৪টি শাহিওয়াল জাতের গরু। কোরবানির হাটে তোলার জন্য শেষ মুহূর্তে গরুগুলোর পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছিলেন শাহীন ও তাঁর স্বামী। গরুর খামারের পাশাপাশি ৩০টি কবুতর, ২৫টি দেশি মুরগি, ২০টি হাঁস ও ৪টি ছাগল পালন করেন শাহীন।
বর্তমানে শাহীন আক্তারের খামারে ১৪টি গরু আছে, যার মূল্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা। কদিন আগে আড়াই লাখ টাকায় দুটি গরু কোরবানির হাটে বিক্রি করেছেন। গরু পালন করে লাভের টাকায় সব দেনা শোধ করেছেন। পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করছেন।
প্রথম আলোকে শাহীন আক্তার বলেন, ‘স্বামীকে বিদেশে পাঠানোর আগে থেকেই হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালন করতাম। সেই সুবাদে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে যাওয়া–আসা ছিল। ধারদেনা করে স্বামীকে বিদেশে পাঠিয়েও যখন ভাগ্য ফেরেনি, তখন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শে গরু পালনের সিদ্ধান্ত নিই। বসতঘরের উঠানে তৈরি করি খামার। ইসলামী ব্যাংক থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে প্রথমে ২টি বাছুর কিনি। সেগুলো বছরখানেক পালন করে বিক্রি করে লাভের মুখ দেখি। পরে উৎসাহ বেড়ে যায়। এরপর উপজেলা যুব উন্নয়ন থেকে স্বল্প সুদে ধারাবাহিকভাবে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে একটু একটু করে খামারের আয়তন বাড়াই। নতুন করে বাছুর কিনে বড় করে বিক্রি করি। এতে লাভের পরিমাণও বাড়তে থাকে।’
শাহীন জানান, বর্তমানে তাঁর খামারের ১৪টি গরুর মূল্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা। কদিন আগে আড়াই লাখ টাকায় দুটি গরু কোরবানির হাটে বিক্রি করেছেন। গরু পালন করে লাভের টাকায় সব দেনা শোধ করেছেন। পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করছেন। শাহীন আক্তারের চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে আলিফ তাহাসিন সবার ছোট। সে স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। স্নাতকোত্তর শেষ করা বড় মেয়ে রেশমা আক্তারের বিয়ে হয়েছে দুই বছর আগে। মেজো মেয়ে সুমাইয়া আক্তার ডিপ্লোমা শেষ করে বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে জাকিয়া সোলতানা চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়ছেন।
শাহীন আক্তারের গরুর খামারে কোনো শ্রমিক নেই। তিনি নিজেই গরুর পরিচর্যা করেন। তাঁকে সাহায্য করেন স্বামী আবু সুফিয়ান। গরুর খাদ্যের জোগান দিতে দুই একর জমি বর্গা নিয়ে সেখানে ভুট্টা ও নেপিয়ার ঘাস চাষ করেছেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে তাঁকে একটি ঘাস কাটার যন্ত্র ও একটি ভুট্টা মাড়াইয়ের যন্ত্র প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ভুট্টা ও ঘাসের পাশাপাশি গরুকে ভুসি ও খইল খাওয়ানো হয়। দিনরাত সমানতালে কাজ করেন শাহীন ও তাঁর স্বামী। গরুগুলোকে গোসল করানো, খাওয়ানো, খামার পরিষ্কার করার সব কাজই করেন মিলেমিশে। বাড়তি হিসেবে রান্নার দায়িত্বও নিতে হয়েছে তাঁকে।
শাহীন আক্তারের গরুর খামারে কোনো শ্রমিক নেই। তিনি নিজেই গরুর পরিচর্যা করেন। তাঁকে সাহায্য করেন স্বামী আবু সুফিয়ান। গরুর খাদ্যের জোগান দিতে দুই একর জমি বর্গা নিয়ে সেখানে ভুট্টা ও নেপিয়ার ঘাস চাষ করেছেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে তাঁকে একটি ঘাস কাটার যন্ত্র ও একটি ভুট্টা মাড়াইয়ের যন্ত্র প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ভুট্টা ও ঘাসের পাশাপাশি গরুকে ভুসি ও খইল খাওয়ানো হয়। দিনরাত সমানতালে কাজ করেন শাহীন ও তাঁর স্বামী।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে শাহীন আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘একসময় এই এলাকায় তেমন কেউ গরু পালন করতেন না। আমার সাফল্য দেখে আশপাশের অনেক নারী এখন গরু পালন করছেন। এটা দেখে ভালো লাগছে। সামনে খামারের পরিধি আরও বড় করব এবং একটি দুগ্ধজাত গরুর খামার গড়ে তুলব। নতুন উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করব।’
লোহাগাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সেতু ভূষণ দাশ প্রথম আলোকে বলেন, ‘শাহীন আক্তার একজন অদম্য নারী। তাঁকে দেখে অন্যরা অনুপ্রাণিত হতে পারেন। এই অঞ্চলে গরুর মাংস ও দুধের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমরা তরুণ উদ্যোক্তাদের ভ্যাকসিন, ওষুধ ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। যে কেউ আমাদের সহযোগিতা নিয়ে গরু পালন করে শাহীন আক্তারের মতো সফল হতে পারেন।’