নেত্রকোনায় দুটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে, ৯ হাজার হেক্টর খেতের ধান পানির নিচে
নেত্রকোনায় ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কংস নদের পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ১০ মিটার এবং উব্দাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ৮১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কংস নদের জারিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমা ৬ দশমিক ৩৫ মিটার আর উব্দাখালী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে ৪ দশমিক ৯০ মিটার।
এ ছাড়া সোমেশ্বরী, মগরা, মহাদেও, ধনুসহ সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ শুক্রবার সকাল নয়টার দিকে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
আজ দুপুর ১২টার দিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রুহুল আমিন বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি, মদন, আটপাড়া, কেন্দুয়া, সদর, বারহাট্টাসহ বিভিন্ন উপজেলার ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর খেতের ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়। তবে গতকাল সকাল থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় পানি আর বাড়েনি। কৃষকেরা এখন বেশ কিছু খেতের ধান কেটে ফেলছেন। এখনো ৮ হাজার ৫৩৪ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত আছে। তবে স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ।
স্থানীয় কৃষক, কৃষি বিভাগ, পাউবো ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে জেলার সব নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকে। বৃষ্টির পানি জমে হাওরসহ নিচু খেতের পাকা বোরো ধান নিমজ্জিত হয়। জেলায় এবার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর খেতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান। এর মধ্যে হাওরে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর খেতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন ধান। কিন্তু গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পানিতে ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর খেতের ধান তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে খালিয়াজুরি উপজেলায় ৪ হাজার ৯৮৫ হেক্টর, কলমাকান্দায় ১ হাজার ৯৫০ হেক্টর, মোহনগঞ্জ উপজেলায় ৬৫০ হেক্টর খেতের ধান তলিয়ে যায়।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, সরকারি হিসাবের চেয়ে দ্বিগুণ খেতের ধান তলিয়ে গেছে। হাওরে ফসল রক্ষার জন্য এ বছর ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। অবশ্য বাঁধের কারণে এখন পর্যন্ত পাহাড়ি ঢলের পানি খেতে প্রবেশ করেনি। খালিয়াজুরি উপজেলার পুরানহাটি গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হাওরে যেসব পানিতে ফসল নিমজ্জিত হয়েছে এই পানি বৃষ্টির। হাওরের অধিকাংশ জলকপাট (স্লুইসগেট) অকেজোসহ নালা-খাল ও নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নামতে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আমাদের ফসল ডুবে এই বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হাওরে এখনো অর্ধেক ধান কাটার বাকি। এ ছাড়া গবাদিপশুর জন্য খড় শুকানো যায়নি।’
কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, একবার ফসলহানি ঘটলে কৃষকদের সারা বছরের ওপর বিপর্যয় নেমে আসে। এই বোরো ধানের ওপর নির্ভর করে কৃষকদের সারা বছরের সংসার খরচ, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়ালেখা ও আচার অনুষ্ঠানসহ সবকিছু হয়।
খালিয়াজুরি পুরানহাটি গ্রামের কৃষক দবির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি পাঙাসিয়ায় হাওরে ৫০ একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। এর মধ্যে মাত্র ১৩ একর খেতের ধান কাটা হয়েছে। বাকি ধান পানির নিচে। একই গ্রামের কৃষক জিয়াউল হক বলেন, ‘কুটিচাপরা হাওরে আবাদ করা ৩০ একর জমির মধ্যে মাত্র ১৪ একর জমির ধান কাটতে পারছিলাম। আর সব ধান পানিতে নষ্ট হইয়া গেছে। কোনো খেরও শুকাইতে পারছি না। গরুগুলো এখন বেচন ছাড়া কোনো পথ নাই। সংসার কীবায় চলব কিছুই বুঝতে পারতাছি না।’
খালিয়াজুরি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, উপজেলায় ২০ হাজার ৩৩২ হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীল ব্রি-৮৮ ব্রি-৮৯ ব্রি-৯২ জাতের ধান বেশি আবাদ করা হয়। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ৫২ শতাংশ খেতের ধান কাটা হয়েছে। ৪ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে। পানি বাড়লে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
মদন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, উপজেলায় ১৭ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। এর মধ্যে ৭৬০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। তবে এ পর্যন্ত ৬৮ শতাংশ খেতের ধান কাটা হয়ে গেছে।
কলমাকান্দা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, তাঁর উপজেলায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
মদনের কুলিহাটি গ্রামের কৃষক আসাদুল্লাহ রিয়াদ বলেন, ‘উচিতপুর হাওরে বৃষ্টির পানিতে অর্ধেক হাওরের ধান পানির নিচে। যে জমিতে ধান এখনো ডুবছে না, সে ধান কাটনের জন্য ২০০০ টাকা রোজ দিয়েও লোক পাওয়া যাইতাছে না। খুবই বিপদে আছি। চোখের সামনে এভাবে সর্বনাশ হচ্ছে।’
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাওরে এখনো সব কটি বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। বাঁধ যাতে না ভাঙে সে বিষয়ে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, হাওরে এখনো বন্যার কোনো পানি আসেনি। যে পানিতে ধান ডুবেছে তা বৃষ্টির জমাটবদ্ধ পানি। এ পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই। হাওরের বিভিন্ন নালা, খালসহ নদ-নদীতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে পানি যদি আর না বাড়ে, আশা করা যায় বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হবে না। গতকাল সকাল থেকে আজ সকাল পর্যন্ত কোনো ভারী বৃষ্টি হয়নি।