ফরিদপুরে নাগরিক কমিটির অনুষ্ঠান ঘিরে আবারও প্রকাশ্যে এল বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল
ফরিদপুরে ‘নাগরিক আলোচনা ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি’ অনুষ্ঠান নিয়ে জেলা বিএনপির দুই পক্ষের পুরোনো বিভেদ আবারও প্রকাশ্যে এল। গতকাল শনিবার বিকেলে শহরের বাজার এলাকায় থানা রোডে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, নগরকান্দা ও সালথা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ। ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য নায়াব ইউসুফকে বিশেষ অতিথি করা হলেও তিনি অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। অনুষ্ঠানে বোয়ালমারী, মধুখালী ও আলফাডাঙ্গা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-১ আসনের জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস মোল্লা বিশেষ অতিথি এবং ও গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনে জামায়াত মনোনীত পরাজিত প্রার্থী আবদুত তাওয়াব অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
জেলা বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুরে বিএনপির রাজনীতি বহু আগে থেকেই বিভক্ত। এর একটি অংশের নেতৃত্ব দেন শামা ওবায়েদ এবং অপর অংশের নেতৃত্ব দেন নায়াব ইউসুফ। এই দুই নেত্রীর বিরোধ যেন উত্তরাধিকার সূত্রে। ১৯৭৯ সালে ফরিদপুরে বিএনপির রাজনীতির সূচনালগ্ন থেকেই এই দুই নেত্রীর মরহুম দুই বাবা কে এম ওবায়দুর রহমান ও চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ দলের দুটি অংশের নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন।
গতকালের অনুষ্ঠান ছিল মূলত শামা ওবায়েদকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া। আয়োজকেরা যে চিঠি দিয়েছিলেন তাতে লেখা ছিল, ‘মিজ শামা ওবায়েদ ইসলামের নাগরিক সংবর্ধনা’। তবে অনুষ্ঠানের দিন ব্যানারে লেখা ছিল ‘নাগরিক আলোচনা ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি’ অনুষ্ঠান।
এর আগে ৭ মে ফরিদপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শামা ও নায়েব সমর্থকেরা প্রকাশ্যে বিরোধে লিপ্ত হন। এরপরে ফরিদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে কোনো অনুষ্ঠানে আসেননি শামা ওবায়েদ। এ প্রেক্ষাপটে গতকাল নাগরিক কমিটির নামে এ আয়োজন করা হয় তাঁর অনুসারীদের উদ্যোগে।
নাগরিক সভায় জামায়াত নেতা আবদুত তাওয়াব বলেন, ‘দাওয়াত কার্ডে অনেকের নাম ছিল, অনেকে নেই। চারজন এমপি—আপনাদের অন্তরে যত বিরোধ থাকুক না কেন আপনারা নিজেরা বসে সমাধান করবেন। আপনারা মিলে মিশে কাজ করুন।’
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘এই ফরিদপুর, যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, এই ফরিদপুর আমাদের সবার। আমার ফরিদপুর, আপনার ফরিদপুর, আমাদের সবার ফরিদপুর। এটা কারও একার ফরিদপুর নয়।’
তবে ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের সমালোচনা করেছেন নায়াব ইউসুফ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জামায়াতকে কোলে নিয়ে রাজনীতি করা বিএনপির আদর্শ নয়। জামায়াত সূচ হয়ে ঢোকে, ফাল হয়ে বের হয়। এরা বিএনপির রাজনীতির ক্ষতি করে। গত জাতীয় নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ আসনে পরাজিত জামায়ত প্রার্থী যে বিপুল পরিমাণ ভোট পেয়েছেন, তা ছিল কল্পনার অতীত। এখন ধীরে ধীরে ভোট পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।’
নায়াব ইউসুফ আরও বলেন, ‘জুয়েল ( ফরিদপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুলফিকার হোসেন ওরফে জুয়েল) আমার বাড়িতে এসে শামা ওবায়েদকে সম্বর্ধনা জানানোর একটি আমন্ত্রণপত্র দিয়ে যান। তখন আমি বাড়িতে ছিলাম না। পরে তাঁর সঙ্গে ফোনে কোনো কথাও হয়নি।’
এ বিষয়ে জুলফিকার হোসেন বলেন, ‘আমি যখন কার্ড নিয়ে নায়াব ইউসুফের বাড়ি ময়েজ মঞ্জিলে যাই তখন তিনি বাড়িতে ছিলেন না। পরে একাধিকবার ফোন করলেও তাঁর ফোনটি রিসিভ করা হয়নি।’
নাগরিক কমিটির আলোচনা সভা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়ে উঠেছেন নায়াব ইউসুফের অনুসারীরা। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়া এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘আমি বিএনপির একজন কর্মী। আমি মাথা উঁচু করে বুক ফুলিয়ে বলতে পারি আমার ভোটেই আমার দলের এমপি নির্বাচিত হয়েছে। বুকে হাত রেখে আপনি বলতে পারবেন তো?’
এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুলফিকার হোসেন (জুয়েল) প্রথম আলোকে বলেন, উনি ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব। তাঁকে বুকে হাত দিয়ে বলতে হইল, প্রমাণ করতে হইল, তিনি ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। এতে কী প্রমাণ হয়? উনি ভোট দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর সেন্টারে ধানের শীষ পরাজিত হয়েছে, এতে কী প্রমাণ হয়?