শিবপুরে বিষ খেয়ে থানায় যাওয়া কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা
নরসিংদীর শিবপুরে ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে থানায় যাওয়া কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশ। আজ শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে ওই কিশোরীর শিক্ষক নার্গিস সুলতানা ওরফে কণিকার বিরুদ্ধে উপপরিদর্শক (এসআই) আফজাল মিয়া বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মারা যাওয়ার আগে থানায় ওই কিশোরীর দেওয়া বক্তব্য মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের বেত্রাঘাত ও অপমান সইতে না পেরে ওই কিশোরী বিষ খেয়ে নিজেই থানায় গিয়ে ঢলে পড়ে। এরপর তাকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মারা যাওয়া প্রভা আক্তার (১৩) উপজেলার বাঘাব ইউনিয়নের জয়মঙ্গল গ্রামের প্রবাসী ভুট্টো মিয়ার মেয়ে। সে শিবপুর সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
আজ দুপুরে সদর হাসপাতালের মর্গে গিয়ে দেখা গেছে, ভেতরে কিশোরীর লাশের ময়নাতদন্ত চলছে। স্বজনেরা পুলিশের কাছ থেকে লাশ বুঝে নিতে মর্গের সামনে অপেক্ষা করছেন। বেলা দুইটার পর লাশ হস্তান্তরের পর তাঁরা দাফনের জন্য লাশ এলাকায় নিয়ে যান। বিকেলে জানাজার পর পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।
মর্গের সামনে ওই কিশোরীর স্বজনেরা জানান, ছোটবেলা থেকেই সে কারও কথা শুনতে চাইত না। পাঁচ মাস আগে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে একবার ইঁদুর মারার বিষ খেয়েছিল। তখন চিকিৎসকদের চেষ্টায় কোনোমতো বেঁচে ফেরে। এরপর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পরিবারে একমাত্র বাবাকেই ভয় পেত সে। কিন্তু সেই বাবাও ছয় মাস ধরে প্রবাসে। তার এসব কর্মকাণ্ডে স্বজনেরা সবাই অতিষ্ঠ ছিল।
নিহত কিশোরীর মা বলেন, ‘আমরা এ ঘটনায় কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে চাই না। শুধু শুধু কারও বিরুদ্ধে দোষ দিয়ে কী লাভ। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। আমরা থানা-পুলিশকেও বিষয়টি জানিয়েছি। মা হিসেবে মেয়েকে তো আমি চিনি। তাই বিষয়টি এখানেই শেষ হোক, এটাই চাই।’
শিক্ষক নার্গিস সুলতানার বাড়িতে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ। তাঁকে আটকের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর বাড়ির প্রতিবেশীরা জানান, বর্তমানে তিনি গ্রেপ্তারের ভয়ে আত্মগোপনে আছেন। এসব কারণে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শিবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাউদ্দিন মিয়া বলেন, কিশোরীর লাশ ময়নাতদন্ত শেষে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ওই ছাত্রী মৃত্যুর আগে থানায় এসে ঘটনার যে বর্ণনা দিয়েছে, সে অনুযায়ী আমরা একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে রেখেছিলাম। এ ঘটনায় কিশোরীর বক্তব্য এজাহারে উল্লেখ করে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়েছে। ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রভার সহপাঠীদের ভাষ্য, প্রভা বিদ্যালয়ের নির্ধারিত পোশাকের সঙ্গে ট্রাউজার পরে এসেছিল। বেলা তিনটার দিকে শ্রেণিকক্ষে আসেন সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক নার্গিস সুলতানা। এ সময় প্রভার ট্রাউজার পরে আসার বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। তিনি প্রভাকে শ্রেণিকক্ষে দাঁড় করিয়ে অপমান করেন। একপর্যায়ে তাকে বেত্রাঘাত করেন ও থাপ্পড় দেন। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের এমন আচরণ মানতে না পেরে প্রভা শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে চলে যায়।
বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে প্রভা শিবপুর বাজারের একটি দোকান থেকে ইঁদুর মারার বিষ কেনে। পরে এটি খেয়ে শিবপুর থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা এইচ আই জিয়ার কাছে যায়। এ সময় প্রভা বলে, ‘ক্লাসে কণিকা ম্যাডাম মেরেছে, তাই ইঁদুর মারার ওষুধ কিনে খেয়েছি।’ এরপরই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পরে থানা থেকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলে প্রধান শিক্ষক নূর উদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরসহ একদল শিক্ষক তাকে থানা থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর সেখানকার জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। খবর পেয়ে প্রভার মা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা হাসপাতালে যান। চেষ্টার পরও অবস্থা স্বাভাবিক না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রধান শিক্ষক নূর উদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় ওই শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কী এমন ঘটেছিল যে ছাত্রী শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে আত্মহত্যা করে ফেলল, বিষয়টি তদন্ত করার জন্য বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির কাছ থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সব সময়ই শিক্ষকদের বলি, শিক্ষার্থীদের মারধর করার দরকার নেই। সমস্যা হলে শিক্ষার্থীদের অভিভাবককে ডেকে টিসি দিয়ে দেব। কিন্তু গায়ে হাত দেওয়ার দরকার নেই। তবুও কেউ কেউ নির্দেশ মানতে চান না।’