চট্টগ্রাম সিটিকরপোরেশনের স্বাধীনতা পদক পেলেন ১৩ গুণীজন ও ৩ প্রতিষ্ঠান

চট্টগ্রামে বইমেলার শেষদিনে সিটি করপোরেশন স্বাধীনতা সম্মাননা স্মারক পাওয়া গুণীজনদের সঙ্গে অতিথিরা। আজ সন্ধ্যা ছয়টায় চট্টগ্রাম জিমনেশিয়াম মাঠেছবি: সৌরভ দাশ

চট্টগ্রামে ১৯ দিনের স্বাধীনতা বইমেলা আজ শনিবার শেষ হয়েছে। শেষ দিনে ১৩ জন ব্যক্তি ও ৩ প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা পদক পদক দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাহিত্যে অবদানের জন্য পাঁচজনকে সম্মাননা পদক দেওয়া হয়।

আজ অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চে গুণীজন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন ও অতিথিরা। স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদানের জন্য প্রয়াত রাজনীতিবিদ আবদুল্লাহ আল নোমান (মরণোত্তর), মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য মো. একরামুল করিম, শিক্ষাক্ষেত্রে চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নূর আহমদ চেয়ারম্যান (মরণোত্তর), চিকিৎসাক্ষেত্রে এম এ ফয়েজ এবং সাংবাদিকতায় দৈনিক পূর্বকোণ-এর সম্পাদক ডা. ম রমিজ উদ্দিন চৌধুরী স্বাধীনতা সম্মাননা পদকে ভূষিত হয়েছেন।

ক্রীড়াক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান, সমাজসেবায় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, স্বাস্থ্যসেবায় চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস), সংগীতে শিল্পী আবদুল মান্নান রানা এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অবদানের জন্য শিল্পী বুলবুল আকতার এই স্মারক সম্মাননা পেয়েছেন।

অন্যদিকে সাহিত্যে অবদান রাখার জন্য সম্মাননা পদক পেয়েছেন গীতিকবিতায় ড. আবদুল্লাহ আল মামুন, শিশুসাহিত্যে সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার, প্রবন্ধ ও গবেষণায় হারুন রশীদ, কবিতায় শাহিদ হাসান এবং কথাসাহিত্যে জাহেদ মোতালেব।

পূর্বকোণ সম্পাদক ম রমিজ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এই সম্মাননা অনেক বড় সম্মানের। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে চট্টগ্রামের প্রান্তিক ও বঞ্চিত মানুষের কথা তুলে ধরেছেন পূর্বকোণ–এ। তবে কোনো ধরনের সম্মাননা বা পদকের জন্য তা করেননি। আজ যে স্বীকৃতি পেয়েছেন, তা ভবিষ্যতে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।

সম্মাননা নিচ্ছেন দৈনিক পূর্বকোণ-এর সম্পাদক ডা. ম রমিজ উদ্দিন চৌধুরী
ছবি: সৌরভ দাশ

গীতিকবিতার জন্য সম্মাননা পেয়েছেন আবদুল্লাহ আল মামুন। ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’ গানের কথা লিখে বিখ্যাত হয়েছেন এই গীতিকার। তিনি বলেন, ‘জীবনে অনেক পদক ও স্বীকৃতি পেয়েছি। তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আজকের যে সম্মাননা পেয়েছি, তার স্বীকৃতি আমার জন্য অন্য রকম অনুভূতি। কেননা এই শহরের সন্তান হিসেবে হোমটাউনেই স্বীকৃতি পেয়েছি। তা নেওয়ার জন্য সিডনি থেকে অস্ট্রেলিয়া থেকে ছুটে এসেছি।’

শেষ হলো বইমেলা

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ও সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সহায়তায় চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম-সংলগ্ন জিমনেসিয়াম মাঠে ৩১ মার্চ শুরু হয়েছিল ১৯ দিনের এ মেলা। এতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১৩০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।

মেলার শেষ দিন বিকেলের পর দর্শনার্থীর ভিড় বাড়লেও তা ছিল প্রত্যাশার চেয়ে কম। এবারের বেচাবিক্রি নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন প্রকাশকেরা। প্রকাশকেরা বলেন, এবার মেলার সময় পাল্টেছে। বইমেলার চেনা আবহ থেকে সময়টা সরে যাওয়ায় পাঠকের উপস্থিতি ও বিক্রি—দুই দিকেই তার প্রভাব পড়েছে। তা তাঁদের জন্য সুখকর নয়।

প্রতিবছর ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় একুশের বইমেলা। তবে এবার জাতীয় নির্বাচন ও পবিত্র রমজানের কারণে এ মাসে মেলার আয়োজন করা যায়নি। পরে স্বাধীনতার মাস মার্চের শেষ দিনে শুরু হয় এ মেলা।

প্রকাশকদের হতাশা

এবারের মেলা নিয়ে প্রকাশকদের কণ্ঠে বেশি শোনা গেছে হতাশার সুর। তাঁদের আক্ষেপ, মেলায় প্রত্যাশিত বেচাবিক্রি হয়নি। পাঠকের উপস্থিতিও আশানুরূপ নয়। এ কারণে আগামী বছর থেকে আবার ফেব্রুয়ারিতে একুশের বইমেলা আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

প্রকাশকদের দাবি অনুযায়ী আগামীবার আবার বইমেলা ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে আয়োজনের আশ্বাস দিয়েছেন আয়োজক প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন।

বই বেচাকেনা নিয়ে প্রকাশকদের আক্ষেপ থাকলেও সিটি করপোরেশনের দাবি, এবার পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে।

প্রথমা প্রকাশনের কর্মী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, এবারের মেলা নিয়ে তাঁরা খুব হতাশ। সব সময় মেলার শেষ দিকে ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিপুল পাঠকের উপস্থিতি থাকে। এবার তেমন কিছু ছিল না। শেষের দিনগুলো নিয়ে আশা ছিল, কিন্তু তা–ও হলো না।

সম্মাননা নিচ্ছেন গীতিকর ড. আবদুল্লাহ আল মামুন
ছবি: সৌরভ দাশ

আরেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কথাপ্রকাশের নির্বাহী (বিপণন) মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, এবারের মেলায় দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল কম। তবে একটা ভালো দিক ছিল, যাঁরা প্রকৃত পাঠক, তাঁদের উপস্থিতি সন্তোষজনক। যাঁরা এসেছেন, তাঁরা সবাই কমবেশি বই কিনেছেন। মেলায় শুধু ঘুরতে আসেন এ রকম লোকের সংখ্যা কম ছিল।

বিকেলে মেলায় ঘুরে দেখা যায়, আগের চেয়ে গতকাল কিছুটা ভিড় বেড়েছিল। তবে তা প্রত্যাশার তুলনায় কম। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বলেন, অনেকেই মেলায় ঘুরতে এসেছেন, বই দেখেছেন, ছবি তুলেছেন; কিন্তু সেই তুলনায় বই কেনার আগ্রহ ছিল কম।

মেলায় অংশ নেওয়া প্রকাশকদের ভাষ্য, আয়োজনজুড়েই বিক্রি ছিল মন্থর। বিশেষ দিনগুলোতে কিছুটা সাড়া মিললেও অধিকাংশ সময় ক্রেতার উপস্থিতি কম ছিল। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ছোট ও স্থানীয় প্রকাশকেরা। মেলায় আসা দর্শনার্থীদের কেউ কেউ বলছেন, ভিড় কম থাকায় স্বস্তিতে স্টল ঘোরা গেছে। পছন্দমতো বই দেখার সুযোগও ছিল।

ইতিহাস পাল্টানো ঠিক হবে না

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, ইতিহাসে যার যা সম্মান তা দিতে হবে। ইতিহাস পাল্টানো ঠিক হবে না।

মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে জিয়াউর রহমানের নাম আপনি বাদ দিতে পারবেন না। তাঁকে ওই জায়গায় আপনাকে সম্মান দিতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর জায়গায় সম্মান দিতে হবে। আমি মনে করি এই জায়গায় কোনো ধরনের ইতিহাস পাল্টানো কখনো সম্ভব নয়।’

সিআরবিতে কোনো হাসপাতাল নয়

অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক মাহফুজুর রহমান বলেন, আজ চট্টগ্রামবাসীর সামনে বিপদ হাজির হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানকে নগরের ফুসফুস খ্যাত সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউট করার জন্য দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু হেরিটেজ হিসেবে খ্যাত সিআরবিতে এ ধরনের কোনো স্থাপনা করতে দেওয়া হবে না। আইনেও নিষেধ রয়েছে। চট্টগ্রামবাসী আন্দোলনে নামবে, মেয়র এ আন্দোলনে সামনে থাকবেন।