বাগেরহাটের ৪টি আসনের ৩টিতে জামায়াতের জয়, বিএনপির পরাজয়ের কারণ কী
গোপালগঞ্জের সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা চিতলমারী, মোল্লাহাট ও পাশের ফকিরহাট নিয়ে বাগেরহাট-১ আসন। আসনটি আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে খ্যাত। বিগত সব কটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে এসেছে আওয়ামী লীগ। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ হীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে স্বল্প ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছে জামায়াত।
আসনটিতে বিএনপি থেকে প্রার্থী করা হয় মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলকে। তিনি একই সঙ্গে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব ও বাংলাদেশ অশ্বিনী সেবা আশ্রমের সভাপতি। তবে বিএনপির রাজনীতিতে তিনি একেবারেই নতুন। আসনটিতে আওয়ামী লীগ থেকে একাধিকবার নির্বাচন করেছেন দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
এখানে হাসিনার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থী ছাড়াও বিএনপির বেশ কয়েকজন ত্যাগী নেতা ছিলেন মনোনয়ন দৌড়ে। তবে তাদের পাশ কাটিয়ে দলটির মনোনয়ন পান আওয়ামী লীগ থেকে সদ্য বিএনপিতে যোগ দেওয়া কপিল কৃষ্ণকে।
আসনটিতে প্রায় সোয়া এক লাখ হিন্দু ভোটার। তবে জিততে পারেনি কপিল। কারণ হিসেবে বিএনপির তৃণমূলের নেতা–কর্মীরা বলছেন, এখানে ‘ভুল’ প্রার্থী নির্বাচন করেছে বিএনপি।
পাশাপাশি আসনটিতে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. মাসুদ রানা ও সাবেক সভাপতি এম এ এইচ সেলিম বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। অনেক নেতা–কর্মীই প্রকাশ্যে ও গোপনে তাঁদের পক্ষে কাজ করেছেন।
স্থানীয় বিএনপির অন্তত ১১ নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা এখানে বিএনপিকে টিকিয়ে রেখেছেন, এমন একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতা থাকলেও দল প্রার্থী করেছে এক বহিরাগতকে। হয়তো হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী ভোট টানতে এমন কৌশল নেওয়া, কিন্তু তাতে আস্থা রাখতে পারেননি ভোটাররা। কারণ, নতুন এই প্রার্থী তাঁদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পারবেন, সেই সংশয় ছিল তাঁদের মনে। ফলে ভোট গেছে জামায়াতে।
এ ছাড়া আসনটিতে এম এ এইচ সেলিম ও মাসুদ রানাও অনেক ভোট কেটেছেন, যা দলের হারের কারণ। আসনটিতে ভোট পড়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৫২২। এর মধ্যে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫২৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতের মো. মশিউর রহমান খান। আর বিএনপির কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল পান ১ লাখ ১৪ হাজার ৩২৩ ভোট। মাত্র ৩ হাজার ২০৪ ভোট ব্যবধানে পরাজিত হয় বিএনপি। যেখানে দুই বিদ্রোহী সেলিম ও মাছুদ রানা ভোট পেয়েছেন যথাক্রমে ৫ হাজার ২৮৩ ও ৬ হাজার ৪৬৭টি।
দলটির এই ১১ হাজার ৭৫০ ভোট ধানের শীষে গেলে বিএনপির প্রার্থীই জয়ী হতেন—এমনটাই বলছেন স্থানীয় বিএনপির নেতারা। এখানে ভুল ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাদের। ভোট–পূর্ববর্তী প্রচারণার সময় গেল দুই সপ্তাহে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন নেতা–কর্মীরাও বলেছিলেন, এখানে প্রার্থী নির্বাচনের ভুল দলকে ভোগাবে। ফলাফলে সেই চিত্রই উঠে এসেছে।
বাগেরহাট ২ (সদর ও কচুয়া)
জেলার গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে ৫১ হাজার ৩০০ ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদের কাছে হেরেছেন বিএনপির মোহাম্মদ জাকির হোসেন। তিনি ৬৬ হাজার ৪০৯ ভোট পান। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী এম এ এইচ সেলিম ভোট পান ৪৮ হাজার ৯৬৫। আগে থেকে বিরাজমান দলীয় কোন্দলে বিভক্ত বিএনপি মূলত নির্বাচন সামনে রেখে দলের প্রার্থী আর স্বতন্ত্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভেদের পাশাপাশি ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা নৈরাজ্যে দলটির নেতা–কর্মীদের সম্পৃক্ততাও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে শঙ্কার জন্ম দেয়।
বিএনপির অনেক নেতা–কর্মীই দলের প্রার্থীকে মেনে নিতে পারেননি। অন্যদিকে বিএনপির বিভক্তিতে প্রচারণাসহ সবখানে এগিয়ে গেছে সুসংগঠিত জামায়াত। সাধারণ ভোটার, এমনকি বিএনপির অনেক কর্মীও বলছেন, তাঁরা এখান থেকে দলীয় প্রার্থী হওয়া জাকির হোসেনকে আগে সেভাবে চিনতেন না। সেই সঙ্গে অভিযোগ আছে, ভোটের এক সপ্তাহ আগেও বিভিন্ন স্থান (বাজার, দোকান, স্ট্যান্ড) থেকে চাঁদা নিয়েছেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা–কর্মী।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বাগেরহাট সদর উপজেলা বিএনপির দুই নেতা রোববার বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী নির্বাচনের আগের সব জনসভায় গিয়ে বলেছেন ‘চাঁদাবাজ-দখলদার মুক্ত বাগেরহাট গড়ব’। তবে বক্তব্যের সময়ও প্রার্থীর পাশেই বসে থাকতেন এমন অভিযুক্ত নেতারা, যা মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল।’
তবে হারের কারণ হিসেবে বিএনপির প্রার্থী জাকির হোসেন আঙুল তুলছেন বিদ্রোহী প্রার্থী সেলিমের ছোট ভাই জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ সালামের বিরুদ্ধে। হারের পর বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশে নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলছেন, ‘আমাদের এক নেতা এখানে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আমি এম এ সালামের কথা বলছি। তিনি রাতের আঁধারে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে মিটিং করেছেন, দলের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন, যার ফলে এত বড় বিপর্যয়।’
নির্বাচনের বাগেরহাট-২ আসনে থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে এম এ সালামও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। দলীয় প্রার্থীর ওই অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দলের প্রতি সম্মান রেখে আমি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করি। ধানের শীষের জন্য ভোট চেয়েছি। তিনি মিথ্যা ও বানোয়াট কথা বলছেন।’ জেলার চারটি আসনের মধ্যে ৩টিতেই পরাজয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে ভুল ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা)
আসনটিতে ১৯৯১ সালে এককভাবে এবং ২০০১ সালে জোটবদ্ধ নির্বাচনে বিজয়ী হয় জামায়াত। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটি জামায়াতকে ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। তবে সেবার জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। এবারের নির্বাচনে আসনটি থেকে বিএনপি মনোনয়ন দেয় মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সভাপতি সোম নাথ দে–কে। জাতীয় পার্টির এই সাবেক নেতা আওয়ামী লীগের শেষ সময়ে দলটিতে যোগ দিয়েছিলেন। অবশ্য নির্বাচনের কয়েক মাস আগে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি।
নতুন মুখকে মনোনয়ন দেওয়ায় শুরুতে নেতা–কর্মীরা কাজ না করলেও শেষ দিকে সবাই সক্রিয় হন। তবে বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে ছিল জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কাজী খায়রুজ্জামান শিপন। গ্রুপিংয়ের কারণে বিএনপির কিছু নেতা–কর্মী তলে–তলে জামায়াতের পক্ষে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয় কয়েকজনের।
দলে নতুন মুখ হলেও স্থানীয় বিএনপির পাঁচ নেতা বলছেন, এখানে বিদ্রোহী হওয়া প্রার্থী ভোটের মাঠে থাকলে বিএনপির পরাজয় হতো আরও বড় ব্যবধানে। কারণ, তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-দখলবাজির বিস্তর অভিযোগ।
আসনটিতে ১৭ হাজার ৭৪১ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন জামায়াতের আবদুল আলীম। তিনি পান ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭ ভোট আর বিএনপির সোম নাথ দে পান ৯৮ হাজার ৩২৬ ভোট।
বাগেরহাট ৩ (রামপাল-মোংলা)
জেলার চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে একমাত্র বাগেরহাট-৩ আসনে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি। ৯১–পরবর্তী নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগ ছাড়া কেউ জেতেনি। জোটবদ্ধ নির্বাচনে আসনটি বরাবরই জামায়াতকে ছেড়ে দিয়ে আসেছে বিএনপি। এবার ৩০ বছর পর প্রথমবার ব্যালটে ধানের শীষ প্রতীক পায় এই আসনের ভোটাররা।
জামায়াতের মো. আবদুল ওয়াদুদকে এখানে ১৯ হাজার ১১১ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয়ী হন বিএনপির শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি পান ১ লাখ ২ হাজার ৬৬১।
বাগেরহাটের চারটি আসনের মধ্যে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী নির্বাচন সবচেয়ে ভালো হয়েছে বলে মনে করেন নেতারা। তবে গ্রুপিংয়ের কারণে এখানেও বিএনপি কিছু ভোট কম পেয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা।
জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির তৃণমূলের অনেক নেতা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ছক মিলিয়েছেন। ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের সমর্থন পেতে এমপিদের প্রভাব থাকে। অনেক স্থানীয় নেতাই প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার ক্ষেত্রে এসব বিবেচনা করেছে। ‘অমুকের সঙ্গে প্রার্থীর সম্পর্ক ভালো, অমুক থাকলে আমি যাব না’—এমন বিরোধ ছিল নিজেদের মধ্যে। প্রার্থী নির্বাচনের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ এই বিরোধও ভোটের মাঠে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন তৃণমূলের কর্মীরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বাগেরহাটের সম্পাদক এস কে হাসিব প্রথম আলোকে বলেন, সাধারণ মানুষ ভয়হীন একটা পরিবেশ, ‘শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা চায়। ভোটাররা এখন দলের পাশাপাশি প্রার্থী, তাঁর ব্যবহার, কর্মকাণ্ড, ইমেজ, কন্ট্রিবিউশন, কন্ট্রোলকেও সমান গুরুত্ব দেয়। ভোটের ফলাফলে যার প্রভাব আছে, তা ছাড়া যেভাবেই দেখেন না কেন, আওয়ামী সমর্থকদের ভোটও একটা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে এবার।’