গত মঙ্গলবার দুপুরে ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে ডাব বিক্রি করছিলেন ছমির উদ্দীন। একের পর এক ক্রেতা আসছেন ভ্যানের কাছে। ডাবের দামদর ঠিক করছেন। এরপর ছমির উদ্দীন হাঁসুয়া দিয়ে ডাবের মুখ কাটছেন। এরপর একটি প্লাস্টিকের ছোট পাইপের এক অংশ ডাবের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ক্রেতা পাইপের অপর অংশে মুখ লাগিয়ে ডাবের পানি পান করছেন। পানি পানের পর ছমির উদ্দীন হাঁসুয়া দিয়ে ডাবটি আড়াআড়িভাবে ফালি দিচ্ছেন। এরপর বাঁশ দিয়ে তৈরি করা কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে শাঁস তুলে ক্রেতাকে দিচ্ছেন।

ডাব কাটার ফাঁকে ফাঁকে ছমির উদ্দীন বলেন, মনিরামপুর উপজেলার ছিলুমপুর বাজারের একটি আড়ত থেকে আগের দিন সন্ধ্যায় ডাব কিনে ভ্যানে করে তিনি বাড়ি ফেরেন। আবার কোনো কোনো দিন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তিনি ডাব কেনেন। পরদিন সকাল সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে ভ্যানে বাড়ি থেকে বের হন। সকাল সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে তিনি যশোর শহরে পৌঁছে যান। এরপর ভ্যানে শহরে ঘুরে ঘুরে তিনি ডাব বিক্রি করেন। শহরের চৌরাস্তার মোড়ে সবচেয়ে বেশি ডাব বিক্রি হয়। কখনো কখনো মনিরামপুর বাজারেও তিনি ডাব বিক্রি করেন।

ছমির উদ্দীন বলেন, প্রতিদিন তিনি ৩৮ থেকে ৪০ টাকা করে ৫০ থেকে ৬০টি করে ডাব কেনেন। শহরে তিনি এই ডাব ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। কখনো কখনো কম দামেও ডাব বিক্রি করতে হয়। দিনে গড়ে ৫০০ টাকা থাকে তাঁর। দুপুরের মধ্যে তাঁর সব ডাব বিক্রি হয়ে যায়। বেলা আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। সপ্তাহে তিন থেকে পাঁচ দিন ডাব কেনা যায়। যেদিন ডাব কেনা যায় না, সেদিন তিনি বেগমপুর থেকে মনিরামপুর রুটে ভ্যান চালান। এতে তাঁর দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়।

ছমির উদ্দীনের বাড়ি মনিরামপুর উপজেলার বেগমপুর গ্রামে। স্ত্রী জাহানারা বেগমকে নিয়ে তাঁর সংসার। তাঁদের এক ছেলে। ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে ছেলে মনিরামপুর পৌর শহরে ভাড়া থাকেন। সেখানে তিনি রিকশা চালান। ছমিরের জমিজিরাত বলতে ছিল মাত্র এক কাঠা। ২০ বছর আগে তাঁর প্রচণ্ড পেটে ব্যথা হয়। কোনো উপায় না পেয়ে মাত্র ২ হাজার ৫০০ টাকায় ওই জমি বিক্রি করে চিকিৎসা নেন। সেই সঙ্গে হারান মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু। এরপর ভাইয়ের এক কাঠা জমির ওপর ছোট একটি ঘর তুলে সেখানে বসবাস শুরু করেন। ২০২১ সালে বেগমপুর গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া একটি ঘর পান তিনি। এর পর থেকে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন।

জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে যাওয়াতে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কোনো ভাতা পাই না। কোনো চালের কার্ডও নেই আমার। ভাতা বা একটি চালের কার্ড হলে খুব ভালো হতো।
ছমির উদ্দীন, ডাব বিক্রেতা

ছমির উদ্দীন আগে দিনমজুরের কাজ করতেন। ২৫ বছর আগে একটি দুর্ঘটনা তাঁর জীবন বদলে দেয়। গাছ কেটে গাছে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় গাছ ঘুরে আঘাত লেগে তিনি উল্টো দিকে পড়ে যান। এতে তাঁর বাঁ পায়ের হাঁটুতে আঘাত লাগে। চিকিৎসা করলেও তিনি আর স্বাভাবিক হতে পারেননি। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। ১০ বছর আগে এলাকার কয়েক ব্যক্তির কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা ধার নিয়ে তিনি একটি ভ্যান কেনেন। শুরু করেন ডাবের ব্যবসা। সাড়ে তিন বছর আগে তিনি একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ইঞ্জিনচালিত একটি ভ্যান কেনেন। দেড় বছর আগে ঋণ শোধ হয়েছে।

ছমির উদ্দীন বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে যাওয়াতে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কোনো ভাতা পাই না। কোনো চালের কার্ডও নেই আমার। ভাতা বা একটি চালের কার্ড হলে খুব ভালো হতো।’