‘চোখের সামনে ঘরটা নদীতে চলে যাচ্ছে, যাওয়ার কোনো জায়গাও নেই’
‘চোখের সামনে ঘরটা নদীতে চলে যাচ্ছে। থাকার মতো আর কোনো জায়গা নেই। ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে কার দরজায় দাঁড়াব, কোথায় যাব। সেটাও জানি না।’
এ কথাগুলো বলছিলেন কফিল উদ্দিন (৪৫)। তিনি কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার কোচপাড়ার বাসিন্দা। ওই এলাকার অবস্থান মাতামুহুরী নদীর পাশে। অতি ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তাঁর বসবাসের একমাত্র ঘরটি নদীতে হেলে পড়েছে। সেখানে আর থাকার উপায় নেই।
গতকাল শনিবার বিকেলে কথা হয় কফিল উদ্দিনের সঙ্গে। পাঁচ দিন পর জীবিকার তাগিদে ট্রলি(শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যান) নিয়ে বের হয়েছিলেন তিনি। ভাঙনের তীব্রতার কথা শুনে নদীর পাড়ে নিজের পরিত্যক্ত ঘরের কাছে আসেন তিনি। সেখানে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। জানালেন, পরিবারে তাঁর চার সন্তান ও স্ত্রী রয়েছেন। বহু কষ্টের টাকা ঘর তুলেছিলেন। এখন নদীতে সেটি বিলীন হতে চলেছে।
নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া ঘরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফিল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবাই বসতঘরটি দেখতে আসছেন। কিন্তু আমাদের খবর নিচ্ছেন না কেউ। কীভাবে কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘সবাই বসতঘরটি দেখতে আসছেন। কিন্তু পেট-পিঠের খবর নিচ্ছেন না। কীভাবে কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’কফিল উদ্দিন, বাসিন্দা, কোচপাড়া, চকরিয়া পৌরসভা
স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে এখন কফিলের রাত কাটে বাড়ির পাশের একটি দোকানের বারান্দায়। আলাপের এক পর্যায়ে এলেন তাঁর স্ত্রী জাহানারা বেগমও। ঘরটা দেখিয়ে কিছু বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি। জাহানারা বেগম বলেন, ‘করোনার সময় অনেক কষ্ট করে স্বামী-স্ত্রী মিলে এই ঘর তুলেছি। ২০২৩ সালের বন্যায় ঘরের একটি কক্ষ নদীতে ধসে পড়েছিল। এবারের বন্যায় পুরো ঘরটিই নদী টেনে নিয়ে যাচ্ছে।’
অবশ্য শুধু কফিল উদ্দিনের বাড়ি নয়। তাঁর এলাকার আরও অন্তত ১২টি বসতঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া অন্তত ২৫টি বাড়ির উঠান নদীভাঙনের কবলে পড়েছে।
গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, বৃষ্টি কমার পর নদীর পানি কিছুটা কমেছে। এর পর থেকে ক্ষতির চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে। অনেক ঘরের নিচে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও ইট খুলে পড়েছে। আবার কোথাও মেঝে দেবে যাচ্ছে।
ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারের লোকজন আর নিজেদের ঘরে থাকছেন না। তাঁদের বাড়ির আসবাব পাকা সড়কের পাশে স্তূপ করে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। উপায় না পেয়ে অনেকেই সড়কের পাশেই রাত কাটাচ্ছেন।
কফিলের পাশের বাড়িটি মিনহাজ উদ্দিনের। তিনি পেশায় দিনমজুর। পরিবারে তাঁর স্ত্রী ও তিন সন্তান রয়েছে। নদীভাঙন এখন তাঁর বসতঘরের দরজা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তাঁর স্ত্রী শাহিন আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ১০ থেকে ১৫ দিন আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু বালুর বস্তা ফেলেছিল। কিন্তু সেগুলো বসতবাড়ির কিনারায় না ফেলে নদীর মাঝখানে ফেলা হয়েছে। ভাঙন রোধে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
শাহিন আক্তারের কথা শেষ হতে না হতেই কথা বলা শুরু করেন ফাতেমা বেগম (৪৫)। তিনি জানান, ২৭ বছর আগে বিয়ের পর এ এলাকায় এসেছিলেন তিনি। তখন মাতামুহুরী নদী বর্তমান অবস্থান থেকে অন্তত ২৫০ ফুট দূরে ছিল। নদীর গতিপথ বদলে পশ্চিম পাড় ভাঙতে ভাঙতে এখন লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে।
স্থানীয় কাউন্সিলর মুজিবুল হক বলেন, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা হয়নি। এ কারণে প্রতি বর্ষা মৌসুমে ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার আতঙ্কে দিন কাটায়।
জানতে চাইলে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ভাঙন রোধে ইতিমধ্যে একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হচ্ছে। জিও ব্যাগের বদলে কংক্রিটের ব্লক দিতে যতটুকু ঢাল দরকার, ততটুকু ঢাল সেখানে নেই। তবে কংক্রিটের ব্লক দেওয়ার বিষয়টি তাঁদের ভাবনায় রয়েছে।