‘৪০০ টাকায় কেনা চামড়া ১৫০ টাকার বেশি দিতে চাইছে না কেউ’

বিক্রির জন্য চামড়া নিয়ে বসে আছেন মৌসুমি বিক্রেতা মোহাম্মদ দিদার । আজ বেলা ৩টায় চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ চৌমুহনী এলাকায়ছবি: জুয়েল শীল

‘সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুরে ৪০টি গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছি। বড় আর মাঝারি আকারের চামড়া। প্রতিটি কিনেছি গড়ে ৪০০ টাকা করে। ১ হাজার টাকা গাড়িভাড়া দিয়ে চট্টগ্রাম নগরের চৌমুহনী এলাকায় এনেছি। এখানে ১৫০ টাকার বেশি কেউ দিতে চাইছে না।’

চামড়ার পাশে বসে হতাশ কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন মৌসুমি বিক্রেতা মোহাম্মদ দিদার। এক বন্ধুর পরামর্শে তিন বছর পর এবার চামড়ার ব্যবসায় নেমেছেন তিনি। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বড় কুমিরা ইউনিয়ন থেকে চামড়া সংগ্রহ করেছেন। পরে সেগুলো নিয়ে এসেছেন নগরের চৌমুহনী এলাকায়।

সড়কের পাশে চামড়া বিছিয়ে বসে ছিলেন দিদার। কথায় কথায় জানালেন, চার বছর আগে একবার চামড়ার ব্যবসা করেছিলেন। তখনো লোকসান হয়েছিল। এরপর তিন বছর আর চামড়া কেনেননি। এবার ভেবেছিলেন, বাজার ভালো হতে পারে। কিন্তু দুপুর গড়াতেই হতাশ হয়ে পড়েছেন। তবে আশা ছাড়ছেন না।

দিদারের হিসাবে, চামড়া কেনা ও পরিবহন মিলিয়ে ইতিমধ্যে তাঁর ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেনা দামও উঠতেছে না। এখন কী করি বুঝতেছি না। এ টাকা তুলতে না পারলে পথে বসে যাব।’

চামড়া নিয়ে একই ধরনের শঙ্কা দেখা গেল মৌসুমি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রুবেলের চোখেও। তবে এবার তিনি আগের চেয়ে সতর্ক। গত বছর লোকসান হয়েছিল। তাই এবার ৩০০টি চামড়া সংগ্রহ করলেও বেশি দামে কেনেননি। প্রতিটি চামড়ার দাম পড়েছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে।

পেশায় মাছ বিক্রেতা রুবেল প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতবার বড় লোকসান হয়েছিল। তাই এবার হিসাব করে চামড়া কিনছি। আশা করছি, কেনা দাম অন্তত উঠবে। কিছু লাভও হতে পারে।’

ঈদের দিন চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বাসাবাড়ি, পাড়ামহল্লা ও মসজিদ থেকে চামড়া সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো নিয়ে আসেন চৌমুহনী এলাকায়। সেখানে চলে অস্থায়ী বেচাকেনা। এরপর আড়তদার কিংবা তাঁদের প্রতিনিধিরা চামড়া নিয়ে যান আতুরার ডিপো এলাকার বড় আড়তে।

গত বছর এই চৌমুহনীতেই চামড়া ফেলে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। লোকসানের মুখে পড়ে অনেকে সড়কের পাশে চামড়া রেখে চলে যান। তবে এবার বিকেল চারটা পর্যন্ত চামড়া ফেলে দেওয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

চৌমুহনীতে অস্থায়ী চামড়ার বাজার

আজ বৃহস্পতিবার ঈদের দুপুর গড়াতেই চৌমুহনী এলাকা পরিণত হয় অস্থায়ী চামড়ার বাজারে। সরেজমিন দেখা গেছে, একের পর এক ভ্যানগাড়ি এসে থামছে। কোথাও রিকশাভ্যানে স্তূপ করে রাখা গরুর চামড়া। কোথাও পিকআপ থেকে নামানো হচ্ছে সদ্য সংগ্রহ করা চামড়া। বাতাসে কাঁচা চামড়ার তীব্র গন্ধ।

সড়কের পাশে সারি করে বসেছেন মৌসুমি বিক্রেতারা। কেউ চামড়া গুনছেন। কেউ মোবাইলে আড়তদারের সঙ্গে দর ঠিক করছেন। কেউ আবার ক্রেতার অপেক্ষায় বসে আছেন। কোথাও দাম নিয়ে তর্ক। কোথাও দ্রুত হাতবদল হচ্ছে চামড়া।

এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট ট্রাক। বেচাকেনা চূড়ান্ত হলেই শ্রমিকেরা দ্রুত চামড়া তুলে দিচ্ছেন ট্রাকে। এরপর সেগুলো চলে যাচ্ছে নগরের আতুরার ডিপো এলাকার আড়তে। পুরো এলাকায় তখন ব্যস্ততা। কারও চোখে লোকসানের শঙ্কা। কেউ দ্রুত বিক্রি করে স্বস্তি খুঁজছেন।

বিক্রি হওয়া চামড়া ট্রাকে তোলা হচ্ছে । আজ বেলা আড়াইটায় চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ চৌমুহনী এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

চৌমুহনীতে কথা হয় মৌসুমি বিক্রেতা মোহাম্মদ আজিজুর রহমানের সঙ্গে। দুপুর পর্যন্ত তিনি ২৫০টি চামড়া সংগ্রহ করেছেন। প্রতিটির গড় দাম পড়েছে ৩০০ টাকা। তবে গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে এবার ঝুঁকি কম নিয়েছেন। বেলা তিনটার দিকে সব চামড়া ছেড়ে দিয়েছেন সামান্য লাভে।

আজিজুর বলেন, ‘এবার আর অপেক্ষা করছি না। গতবার বেশি লাভের আশায় থেকে বিপদে পড়েছিলাম। তাই এবার দ্রুত বিক্রি করে দিয়েছি। প্রতিটিতে ৫০ টাকার মতো লাভ হয়েছে।’

আরেক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ দুলাল এবারও বড় পরিসরে চামড়ার ব্যবসা করছেন। তিনি আড়াই থেকে তিন হাজার চামড়া সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়েছেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন আকারের ৬০০ গরুর চামড়া কিনেছেন। দাম পড়েছে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে।

বাজার পরিস্থিতি নিয়ে দুলাল বলেন, ‘চামড়ার ব্যবসায় ঝুঁকি সব সময় থাকে। এবারও আছে। তাই খুব হিসাব করে কিনছি। বেশি দামে চামড়া নিচ্ছি না। আড়তদারেরাও সতর্ক থাকতে বলছেন। তবে মনে হচ্ছে, এবার গতবারের মতো খারাপ হবে না।’

চৌমুহনী এলাকায় এবার এমন অনেককে দেখা গেছে, যাঁরা গত বছর চামড়ার ব্যবসা করেছিলেন। কিন্তু লোকসানের পর এবার আর মাঠে নামেননি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার প্রতিবছর চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে সেই দাম কার্যকর হয় না। এ বছর ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা। ঢাকার বাইরে নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। তবে তাঁদের দাবি, কাগজে দাম বাড়লেও বাস্তব বাজারে তার প্রভাব খুব কম।

চট্টগ্রাম বৃহত্তর কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এবার তাদের ৪০ জনের মতো আড়তদার চামড়া কিনছেন। চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ৪ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বিকেল চারটায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দামে চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে। এবার অন্তত মৌসুমি বিক্রেতারা কিছুটা দাম পাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত চামড়া ফেলে দেওয়ার কোনো খবর পাইনি।’