কৃষি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) একটি গবেষণায় বগুড়ায় উৎপাদিত কিছু টাটকা সবজিতে অতিমাত্রায় কীটনাশকের উপস্থিতি মিলেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়ার উপপরিচালক দুলাল হোসেন বলেন, বগুড়ার কৃষকেরা সবজিখেতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করেন। কীটনাশক ছিটানোর পরপরই খেত থেকে সবজি তুলে বিক্রি করা ঠিক নয়। ফসলে বিষাক্ত রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে জৈব কীটনাশক এবং কীটপতঙ্গ দমনের প্রাকৃতিক পদ্ধতি ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৃষকদের নানাভাবে সচেতন করা হচ্ছে।

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাইলের পর মাইল জুড়ে শীতের হরেক রকম সবজি চাষ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে মুলা, শিম, বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাজরসহ শীতের বেশ কিছু আগাম সবজি বাজারে উঠেছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এসব সবজির দাম বেশি। কৃষকেরা বলেন, ভালো দাম পাওয়ায় শীতকালীন সবজি চাষে তাঁদের আগ্রহ বেড়েছে। আবার আবহাওয়াও অনুকূলে।

শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি গ্রামের প্রান্তিক কৃষক আবদুর রহিম (৩৭) দেড় দশক ধরে সবজির চাষ করছেন। ২০০৭ সালে বিঘাখানেক জমিতে টমেটো ও বেগুন লাগানোর মধ্য দিয়ে সবজির চাষ শুরু করেন। গতকাল শনিবার সকালে শাজাহানপুর উপজেলার নয়মাইল হাটে বেগুন বিক্রি করতে আসেন রহিম। তিনি বলেন, ধান চাষে লাভ নেই। শুধু ভাতের জন্যই বিঘা দুয়েক জমিতে আমন ধানের চাষ করেছেন। বাকি তিন বিঘায় শীতকালীন নানা সবজি লাগিয়েছেন। এক দশক আগেও সবজিখেতে দুই সপ্তাহে একবার কীটনাশক ছিটালে চলত। এখন পোকা আর রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেড়েছে। দুদিন পরপর খেতে কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। কীটনাশক ছিটানোর পরপরই কোনো কোনো সবজি খেত থেকে তুলে হাটে নিতে হয়।

শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা শ্মশানকান্দি গ্রামের কৃষক আবদুল ওয়াহেদ (৪৫) আট বিঘা জমি চাষ করেন। একসময় শুধু আমন, বোরো ধান আর কলা চাষাবাদ করতেন। কয়েক বছর ধরে অন্য ফসলের চাষাবাদ কমিয়ে সবজি চাষে ঝুঁকছেন। এ বছর তিনি ফুলকপি, পটোল, আগাম জাতের আলু এবং বিভিন্ন জাতের শাক চাষ করেছেন। তিনি বলেন, আগামী বছর আমন চাষ কমিয়ে পুরো জমিতেই সবজি চাষাবাদের ইচ্ছা আছে। ধান চাষের বদলে সবজিতে ঝুঁকেছেন কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধান চাষে লোকসান দিতে হয়। সবজি চাষে চার গুণ লাভ।

শুধু কৃষকেরা নন, সবজি চাষে ঝুঁকছেন শিক্ষিত তরুণেরাও। শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি গ্রামের আবদুল আলিম (৩১) সরকারি আজিজুল হক কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর। তিনি এ বছর ১৫ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করেছেন। এর মধ্যে পাঁচ বিঘায় আছে সবজি। খেতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনা করে এই কৃষক ভারমি কম্পোস্ট সার ব্যবহার করছেন। অরগানিক পদ্ধতিতে পোকামাকড় দমন করছেন।

আবদুল আলিম বলেন, কীটনাশক ছিটানো খেতের সবজি খেয়ে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এ কারণে কীটনাশকের ব্যবহার শূন্যতে আনতে নানা প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। পাশাপাশি অন্যদের সচেতন করতে কাজ করছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক দুলাল হোসেন বলেন, এ বছর সবজির ভালো দাম পেয়ে খুশি কৃষকেরা। তাই তাঁরা শীতকালীন সবজি চাষে ব্যাপক আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এবার সব মিলিয়ে ২৩ হাজার ৯৩৫ হেক্টর জমিতে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রতি কেজি সবজির গড় মূল্য ২০ টাকা হিসাবে এই উৎপাদিত সবজির বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক জাকারিয়া রানা বলেন, কীটনাশক ছিটানোর পরপরই খেত থেকে সবজি তুলে বিক্রি করলে তা খেয়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া কীটনাশক দেওয়া সবজি খেয়ে কিডনি, যকৃতের জটিলতাসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।