নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে স্বর্ণ বিক্রি করবেন স্ত্রী, সঞ্চয় ভেঙে টাকা দেবেন মা

চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের অধিকাংশ প্রার্থী এবার ধার ও দানের টাকায় নির্বাচন করার কথা বলেছেন হলফনামায়। নগদ অর্থ ও সম্পদ থাকার পরও অধিকাংশ প্রার্থী এভাবে নির্বাচনী ব্যয় মেটানোর কথা বলেছেন।

চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহগাড়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহগাড়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিনের নির্বাচনী খরচ মেটাতে স্বর্ণ বিক্রি করবেন স্ত্রী আনোয়ারা বেগম। সোনা বিক্রির ২০ লাখ টাকা স্বামীকে দান করবেন তিনি। প্রার্থী নাজমুলের ছেলে আজিজুল হাকিম বাবাকে দান করবেন ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ৪৩০ টাকা। নাজমুল মোস্তফা আমিন নিজের পকেট থেকে খরচ করবেন ১৫ লাখ টাকা।

নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, নাজমুল মোস্তফা আমিনের স্ত্রীর কাছে সোনা রয়েছে ১৫ ভরি। এখন সোনার প্রতি ভরির দাম ২ লাখ ২২ হাজার ৭২৪ টাকা। অর্থাৎ স্ত্রীর কাছে থাকা সোনার বর্তমান বাজারমূল্য ৩৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর সম্ভাব্য ব্যয় ৫০ লাখ ৬২ লাখ ৫৯০ টাকা। নিজের আয় থেকে ১০ লাখ ৬২ হাজার ৫৯০ টাকা খরচ করবেন। প্রবাসী দুই ভাই ও ব্যবসায়ী ভায়রা দান করবেন ২৪ লাখ টাকা। তাঁদের বাইরে তিন ব্যক্তির কাছ থেকে দান হিসেবে নেবেন ১৬ লাখ টাকা। যদিও তাঁর হাতে ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা নগদ রয়েছে। স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে সম্পদ আছে ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকার।

চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের বিএনপির প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরী।

চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের বিএনপির প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরী নিজের টাকার পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে মায়ের কাছ থেকেও টাকা নেবেন। তাঁর মা ফরহাত কাদের চৌধুরী নিজের জমানো টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা দেবেন ছেলেকে।

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এই তিন আসনের মতো চট্টগ্রামের অন্যান্য আসনেও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর অধিকাংশ প্রার্থী নির্বাচনী ব্যয় মেটাবেন ধার ও দানের টাকায়। এবারের ১৬ আসনে ১৭ জন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। তাঁদের মধ্যে দুজনের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব পাওয়া যায়নি। বাকি ১৫ জনের মধ্যে ৯ জন দান নেবেন এবং ধার করবেন। জামায়াতের ১৪ প্রার্থীর মধ্যে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে একজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। একজনের হিসাব পাওয়া যায়নি। বাকি ১২ জনের সবাই নির্বাচনী ব্যয় মেটাবেন ধার ও দানের টাকায়।

বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে আসলাম চৌধুরীর স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। তিনি এ নির্বাচনে খরচ করবেন ৩২ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের পকেট থেকে ব্যয় করবেন ২৫ লাখ। বাকি সাত লাখ টাকার মধ্যে স্ত্রী জামিলা নাজনীল মাওলার কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা ধার করবেন। মেয়ে মেহরীন আনহার উজমার কাছ থেকে দান হিসেবে নেবেন দুই লাখ টাকা।

নির্বাচনে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাব্য উৎসের বিবরণ দিতে হয়। এতে কোন উৎস থেকে কত টাকা পাওয়া যেতে পারে, তা উল্লেখ থাকে। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে হলফনামার পাশাপাশি এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, একজন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় হবে তাঁর নির্বাচনী এলাকার ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হারে অথবা মোট ২৫ লাখ টাকা—এ দুটির মধ্যে যেটি বেশি হয়। সে হিসাবে এবার প্রার্থীরা আসনভেদে ২৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করার সুযোগ পাবেন।

দান-ধারে ভরসা প্রার্থীদের

চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহগাড়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী।

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩৫৮ কোটি ৯৮ লাখ ৫৮ হাজার ৬৩২ টাকার। এই সম্পদের বর্তমান মূল্য ৪৩০ কোটি ৭৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২১ কোটি ৮০ লাখ ৬৪ হাজার ১৭৭ টাকার। হাতে নগদ রয়েছে ১১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

চট্টগ্রামে বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে আসলাম চৌধুরীর স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। তিনি এবারের নির্বাচনে খরচ করবেন ৩২ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের পকেট থেকে ব্যয় করবেন ২৫ লাখ টাকা। এই টাকার উৎস ব্যবসা থেকে আয় করা। বাকি সাত লাখের মধ্যে স্ত্রী জামিলা নাজনীল মাওলার কাছ থেকে থেকে পাঁচ লাখ টাকা ধার করবেন। মেয়ে মেহরীন আনহার উজমা বাবাকে দান করবেন দুই লাখ টাকা। তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে এই টাকা দেবেন ব্যবসা থেকে।

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ আছে ১৫ কোটি ৫৩ লাখ ২৩ হাজার ৮২৩ টাকার। হাতে নগদ আছে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার ২৫৪ টাকা। বিপুল সম্পদ থাকার পরও নির্বাচনী খরচ মেটাতে দানের ওপর ভর করতে হচ্ছে এই বিএনপি নেতাকে। নিজের পকেট থেকে সাড়ে ১৮ লাখ টাকা খরচ করলেও বাকি টাকা দান হিসেবে নেবেন স্ত্রী সাদিয়া এরশাদের কাছ থেকে। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এরশাদ উল্লাহ ও তাঁর স্ত্রীর টাকার উৎস হচ্ছে ব্যবসা, ঘরভাড়া ও শেয়ার থেকে আয়।

চট্টগ্রাম-১০ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী।

চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের নুরুল আমিন খরচ করবেন ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা নিজের আয় থেকে। ২০ লাখ টাকা ধার নেবেন জামাতা মো. সোহেল সরওয়ারের কাছ থেকে। দুজনেরই আয়ের উৎস ব্যবসা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নির্বাচন করছেন চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসন থেকে। তিনি নির্বাচনে ২৫ লাখ টাকা খরচ করবেন। ব্যবসা থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ করবেন। বাকি ১৫ লাখ টাকা ধার নেবেন স্ত্রী তাহেরা আলমের কাছ থেকে। তিনি ব্যবসা ও ঘরভাড়ার টাকা দেবেন স্বামীর নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-৬ আসনের গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর নগদ টাকা আছে ১ কোটি ৭৫ লাখ ৩২ হাজার ১৫৪ টাকা। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ১৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকার। নির্বাচন করতে স্ত্রী, ছেলে ও ভাইয়ের কাছ থেকে নেবেন ২৫ লাখ টাকা। তাঁদের আয়ের উৎস ব্যবসা। নিজের পকেট থেকে খরচ করবেন ১০ লাখ টাকা।

নিজেদের পকেটের পাশাপাশি দানের টাকায় নির্বাচন করবেন চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম ও চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের বিএনপির মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী।

জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে ৪২ থেকে ৪৫ লাখ টাকা সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব দিয়েছেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, চট্টগ্রাম-১১ আসনের মোহাম্মদ শফিউল আলম ও চট্টগ্রাম-২ আসনের মুহাম্মদ নুরুল আমিন। শামসুজ্জামান হেলালী সম্ভাব্য ব্যয়ের ১৮ লাখ টাকা, শফিউল আলম ১৭ লাখ টাকা ও নুরুল আমিন ২২ লাখ টাকা খরচ করবেন আত্মীয় ও অন্য ব্যক্তিদের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দান থেকে। নির্বাচনের জন্য শফিউল আলম ২২ লাখ ও শামসুজ্জামান হেলালী ১৫ লাখ টাকা ধারের কথা উল্লেখ করেছেন। চট্টগ্রাম-১ আসনের ছাইফুর রহমান ধার করবেন পাঁচ লাখ টাকা।

২০ থেকে ৩৭ লাখ টাকা সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব দিয়েছেন সাতজন। তাঁদের মধ্যে চট্টগ্রাম-৪ আসনের মো. আনোয়ার ছিদ্দিক ১০ লাখ ও চট্টগ্রাম-১৩ আসনের মাহমুদুল হাসান ২ লাখ টাকা ধার থেকে প্রাপ্ত অর্থ ব্যয় করবেন বলে উল্লেখ করেছেন। নিজের আয় থেকে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করবেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের মো. আবু নাছের। পেশাগত আয় ও বেতন থেকে প্রাপ্ত ৩০ লাখ টাকা নির্বাচনী ব্যয় হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি। তাঁর বার্ষিক আয় সাড়ে ৪৮ লাখ টাকার বেশি।

নিজের টাকায় নির্বাচন

বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনের মোস্তফা কামাল পাশা, চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী-বায়েজিদ বোস্তামী) আসনের মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের গোলাম আকবর খন্দকার, চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-ডবলমুরিং) আসনের সাঈদ আল নোমান ও চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনের জসীম উদ্দীন আহমেদ নিজের টাকায় নির্বাচন করবেন।