পাবনায় চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ, দিনাজপুরে ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো পাবনা ও দিনাজপুরেও বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় দুই জেলাতেই লোডশেডিং বেড়েছে। এতে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কৃষিতে সেচসংকট তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।
অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ, উৎপাদনে ধস
পাবনায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে একদিকে কলকারখানায় কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে কৃষি আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
জেলা শহরের অন্তত ১০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টায় ৫ থেকে ৬ বার লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিবার প্রায় এক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকে না। এতে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে শহরবাসীকে।
জেলা শহরের ক্ষুদ্র একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালান ইয়াসিন আলী। তিনি জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে চানাচুর, চিপসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি হয়। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শ্রমিকেরা কাজ করেন; কিন্তু এই সময়ের মধ্যে অন্তত চারবার বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে শ্রমিকেরা বসে বেতন নেন, উৎপাদনও কমে যায়।
জেলা শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ নিয়ে কিছু বলতে পারছি না। চাহিদা ও সরবরাহ বিষয়ে জানতে হলে হেড অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।’
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নেসকোর এক কর্মকর্তা জানান, জেলা শহরে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ৪১ থেকে ৪৭ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে ১৭ থেকে ২২ মেগাওয়াট।
পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক এ বি এম ফজলুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে জেলার প্রতিটি কলকারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এতে উৎপাদন যেমন কমেছে, তেমনি কারখানার মালিকদের খরচও বেড়েছে।
উপজেলা পর্যায়েও একই চিত্র। পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ সূত্রে জানা গেছে, তাদের আওতাধীন এলাকায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ৯৭ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ মেগাওয়াট। ফলে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে।
সুজানগর উপজেলার ভিটবিলা গ্রামের কৃষক সুজন হোসেন বলেন, বিদ্যুৎবিভ্রাট চরমে পৌঁছেছে। দিনে রাতে চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এতে সেচকাজ ব্যাহত হচ্ছে। তবে বৃষ্টির কারণে এখনো ফসলের তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে বৃষ্টি না থাকা সময়ে বিদ্যুতের সরবরাহ কমলে কৃষক ক্ষতির মুখে পড়বেন।
পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ডিজিএম উত্তম কুমার সাহা বলেন, পল্লী বিদ্যুতের এখনো সরবরাহ ভালো। চাহিদার তুলনায় ১৫ থেকে ১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম মিলছে। তবে এতে তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
দিনাজপুরে গ্রামে ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না
দিনাজপুরেও গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে লোডশেডিং বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
বিরল উপজেলার মহাজনপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোসলেম উদ্দিন (৬২) বলেন, ‘শনিবার দুপুর ১২টায় বিদ্যুৎ গেছে, এসেছে আড়াইটায়। তারপর রাত ৮টায় গেছে, এসেছে রোববার বেলা সাড়ে ১১টায়। অবশ্য গতকাল ঝড়বৃষ্টির কারণে হয়তো সমস্যা হয়েছে; কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুতের ঝামেলা বেড়েছে। ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ছয়-সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।’
রোববার দিনাজপুর সদর, বিরল ও বোচাগঞ্জ উপজেলার অন্তত ১৫ জন বাসিন্দা, অটোরাইস মিলের মালিক ও কৃষকের সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শহরের ছোটগুড়গোলা এলাকার বাসিন্দা মলি রানী বলেন, ‘দিনের বেলাও তিন-চারবার কারেন্ট যায়। বাড়িতে অসুস্থ বাবা, ছোট বাচ্চা। রান্নাবান্না করতে হয় ইলেকট্রিকের চুলায়। সব মিলিয়ে ভোগান্তি পোহাচ্ছি।’
দিনাজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় গরমে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ১০০ থেকে ১২২ মেগাওয়াট। তবে এখন সরবরাহ কমে গেছে। বিভিন্ন সময়ে চাহিদার বিপরীতে ২৫ থেকে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে।
সমিতির উপব্যবস্থাপক (কারিগরি) সীমা রানী কুন্ডু বলেন, চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কিছুটা কমেছে। এ জন্য এলাকাভেদে এক থেকে দুই ঘণ্টা কয়েকটি ফিডার বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গতকালের ঝড়বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় সংযোগে সমস্যা হয়েছে। এ জন্য চাহিদা ও সরবরাহে সমস্যা নেই।
দিনাজপুরে নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, ‘মোট ১৭টি ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। সর্বোচ্চ গরমে আমাদের চাহিদা ২৭-২৮ মেগাওয়াট, স্বাভাবিক সময়ে চাহিদা থাকে ২০-২২ মেগাওয়াট। বর্তমানে খুব একটা ঘাটতি নেই। তবে দিনের বেলা তিন-চারটি ফিডারে এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।’
দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক সহিদুর রহমান বলেন, দিনে তিন-চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। বর্তমানে সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ কম পাচ্ছেন। ডিজেলের ওপরে নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদনের খরচ বাড়ছে।