ছেলের টানে যুক্তরাজ্য থেকে ছুটে এলেন মা, ১০ বছর পর টেনে নিলেন বুকে
১০ বছর পর ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন মা। কেবল ছেলেকে দেখতেই হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে সুদূর যুক্তরাজ্য থেকে ছুটে আসেন তিনি। যুক্তরাজ্যেই জন্ম ছেলের। স্বামীও থাকেন সেখানে। জন্মের দেড় বছর পর স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে সে দেশের সরকারি সোশ্যাল কেয়ারে ঠাঁই হয় ছেলের। এরপর যুক্তরাজ্যের আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশে থাকা দাদির জিম্মায় দেওয়া হয় ছেলেকে। দাদির কাছে আসার পর গত ১০ বছর ছেলের স্পর্শ পাননি। মাঝে কয়েকবার মুঠোফোনে ভিডিও কলে কথা হয়েছিল। তবে এরপর সেই যোগাযোগের সূত্রও হারিয়ে ফেলেন। আজ সোমবার বিকেলে চট্টগ্রামে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার (লিগ্যাল এইড) কার্যালয়ে সন্তানকে কাছে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন এই মা।
লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের উদ্যোগে মা-ছেলের মধ্যে এই পুনর্মিলন সম্ভব হয়েছে। সূত্র জানায়, ২০১১ সালে শিশুটির মা-বাবার বিয়ে হয়। বাবা আগে থেকে যুক্তরাজ্যে ছিলেন। বিয়ের পর মাও সেখানে যান। ২০১৩ সালে সেখানে শিশুটির জন্ম হয়। এরপর দেড় বছর পর মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। শিশুটির ঠাঁই হয় সোশ্যাল কেয়ারে। বিচ্ছেদের পর শিশুটির অধিকার নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন মা–বাবা। মা-বাবা কারও কাছে শিশুটিকে নিরাপদ মনে না করে আদালত তাকে তার দাদির কাছে লালন–পালনের আদেশ দেন। তবে শর্ত দেন, শিশুটি ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারবে। মা শিশুটির জন্য উপহার পাঠাতে পারবেন। ২০১৬ সালে শিশুটি যুক্তরাজ্য থেকে চট্টগ্রামে দাদির কাছে চলে আসে। সেখানে বেড়ে উঠতে থাকে। কিছুদিন মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। পরে তার মা আর যোগাযোগ করতে পারেননি।
২০২৪ সালে ছেলের খোঁজে বাংলাদেশে আসেন মা। তখন সন্ধানও পান ছেলের। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। এরপর তিনি আবার যুক্তরাজ্যে ছুটে যান। সেখানকার আইনজীবী ও বাংলাদেশের আইনজীবীর সঙ্গে আলাপ করেন। কিছু আইনজীবী মামলা করার পরামর্শ দেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জহিরুল ইসলাম তাঁকে মামলা না করে লিগ্যাল এইডে আবেদন করার পরামর্শ দেন। কারণ, মামলা করলে নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে। শেষমেশ গত ১৭ মে লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম কার্যালয়ে অনলাইনে আবেদন করেন মা। সেখানে তিনি যুক্তরাজ্যের আদালতের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের আবেদন করেন।
লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তা এরশাদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আবেদনটি গ্রহণ করে দুই পক্ষকে হাজির হতে নোটিশ দেওয়া হয় লিগ্যাল এইডের বিচারকের নির্দেশে। উভয় পক্ষ আজ হাজির হয়। মা আসেন যুক্তরাজ্য থেকে।
আদালত দুই পক্ষকে শর্ত দেন, আবেদনকারী মা ও শিশুসন্তানের মধ্যে দূরত্ব নিরসনে দুই পক্ষ সচেষ্ট হবে। মাসের প্রথম সপ্তাহে এক ঘণ্টা অনলাইনে ছেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন মা। মা-ছেলের মধ্যে সম্পর্ক তৈরির জন্য বর্তমান অভিভাবকেরা শিশুটিকে উদ্বুদ্ধ করবেন। মা যদি দেশে এসে দেখা করতে চান, উভয় পক্ষ মিলে সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করবে। এ ছাড়া বিশেষ কোনো দিন বা উৎসবে মা দেশে থাকলে সরাসরি, দেশে না থাকলে অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন বা কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমে উপহার পাঠাতে পারবেন। শিশুটির সঙ্গে মা এমন কোনো কথা বলবেন না, যাতে মানসিক ক্ষতি হয়। এ ছাড়া বর্তমান অভিভাবকেরা সন্তানের মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর কোনো ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবেন। উভয় পক্ষ এসব শর্ত মেনে নেয়। পরে মা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। ওই সময় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে আসা শিশুটির চাচা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে শিশুটিকে তার দাদি লালন–পালন করছেন। শিশুটি দাদির কাছে ভালো আছে। বিষয়টি আমি লিগ্যাল এইডের বিচারককেও জানিয়েছি। এখন আদালত যে নির্দেশনা দিয়েছেন, আমরা তা পালন করছি।’ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে আমরা কোনো ঠিকানা পরিবর্তন করিনি। শিশুটির মা যখনই যোগাযোগ করেছেন, আমরা সাড়া দিয়েছি।’
লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা (সিনিয়র সহকারী জজ) সুব্রত দাশ প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাজ্যের আদালতের রায়ের সঙ্গে সংগতি রেখে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আপস মীমাংসা হয়েছে। এ ঘটনায় শিশুটির সর্বোচ্চ কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
লিগ্যাল এইডে আপস মীমাংসার তারিখ পড়ার পর যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে ছুটে আসেন মা। আজ দুপুরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘১০ বছর পর ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেছি। এর চেয়ে সুখের আর কিছু নেই আমার কাছে।’ এত দিন কেন আসেননি—প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের পর অনলাইনে যোগাযোগ হতো। পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করে পাইনি। করোনা, অভিবাসন জটিলতায় দেশে আসতে পারিনি। এখন লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে কম সময়ে বিষয়টি সুরাহা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আমি আমার ছেলের সাক্ষাৎ পেয়েছি।’