কাপ্তাই হ্রদের কাচকি-চাপিলা মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক, যেসব কারণ জানালেন গবেষকেরা

রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে জেলেদের জালে ধরা পড়া মাছ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি শহরের ফিশারি মৎস্য অবতরণ ঘাটেছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদের মাছেও উদ্বেগজনক মাত্রায় ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার (মাইক্রোপ্লাস্টিক) উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ডিসকাভার এনভায়রনমেন্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণাটি করেছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) ফিশারিজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের একদল শিক্ষক-শিক্ষার্থী। তাঁরা হলেন নিশাত আক্তার, মো. তানভীর হোসেন, মোহাম্মদ শাকিল খান, জোবায়ের আলম, মো. তারেক, ইফতেখের আহমেদ, ইনকিয়াদ আহমেদ, সাইফুদ্দিন রানা, এস কে আহমদ আল নাহিদ ও শাহিদা আরফিন।

কাপ্তাই হ্রদের পাঁচটি দেশীয় ছোট মাছের ওপর এই গবেষণা করা হয়। মাছগুলো হলো কাচকি, চাপিলা (গুটি মাছ), ট্যাংরা, মলা ও ঢেলা (রোহতি)। গবেষণার জন্য রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার, সুবলং বাজার ও বিএফডিসি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে ৫ প্রজাতির ৭৫টি মাছের নমুনা সংগ্রহ করে গবেষক দল।

গবেষণায় দেখা গেছে, নমুনা হিসেবে নেওয়া সব মাছের ভেতরেই মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণা বিদ্যমান। এর মধ্যে হ্রদের তলদেশের কাদা ও বালু থেকে খাবার গ্রহণ করা ট্যাংরা মাছের দেহে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। ট্যাংরা মাছে প্রতি গ্রামে গড়ে শূন্য দশমিক ৬৩টি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মিলেছে। গবেষকেরা বলছেন, হ্রদে ফেলা গৃহস্থালি বর্জ্য, পর্যটকদের ব্যবহৃত প্লাস্টিক এবং মাছ ধরার পুরোনো জালের কারণেই এ দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে।

গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, মাছে পাওয়া প্লাস্টিক কণাগুলোর ৮৫ শতাংশই ছিল সুতা বা ফাইবার আকৃতির। আর রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর ৭১ শতাংশই পলিথিন, যা মূলত প্লাস্টিকের ব্যাগ, বোতল ও প্যাকেজিং সামগ্রী থেকে তৈরি। নীল, কালো ও সাদা রঙের প্লাস্টিককণার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে হ্রদে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য ও প্লাস্টিকজাত সরঞ্জাম দীর্ঘদিন পানিতে ভেসে ও ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হচ্ছে।

নমুনা হিসেবে নেওয়া সব মাছের ভেতরেই মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণা বিদ্যমান। এর মধ্যে হ্রদের তলদেশের কাদা ও বালু থেকে খাবার গ্রহণ করা ট্যাংরা মাছের দেহে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। ট্যাংরা মাছে প্রতি গ্রামে গড়ে শূন্য দশমিক ৬৩টি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মিলেছে।

গবেষকদের মতে, কাপ্তাই হ্রদের আশপাশের এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এবং অসচেতনতার কারণে ড্রেন ও বৃষ্টির পানির সঙ্গে প্লাস্টিক হ্রদের পানিতে গিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পর্যটন এলাকা ও স্থানীয় বাজারগুলো থেকে ফেলা বর্জ্য এই পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রধান কারণ।

গবেষণায় যুক্ত গবেষকেরা সতর্ক করে বলেন, কাপ্তাই হ্রদের ছোট মাছগুলো সাধারণত নাড়িভুঁড়িসহ পুরোটা রান্না করে খাওয়া হয়। ফলে মাছে জমে থাকা এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা সহজেই মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিকযুক্ত মাছ খেলে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের শরীরে প্রদাহ, মেটাবলিক (বিপাকজনিত) সমস্যাসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

রাঙামাটির ফিশারি মৎস্য অবতরণ ঘাটে বিক্রি হচ্ছে কাপ্তাই হ্রদে ধরা পড়া নানা প্রজাতির মাছ। সম্প্রতি তোলা
ছবি: প্রথম আলো

কাপ্তাই হ্রদের জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন গবেষক দলের সদস্যরা। তাঁরা মনে করেন, হ্রদের নিকটবর্তী বাজার, পর্যটনকেন্দ্র ও বসতিগুলোয় পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ রোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।

জানতে চাইলে গবেষক দলের অন্যতম সদস্য, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিভাসু) ফিশারিজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন রানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বড় প্লাস্টিক থেকে ছোট প্লাস্টিক হয়। ছোট প্লাস্টিক খাবার হিসেবে গ্রহণ করে মাছ। এর ফলে মাছের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়।’

এখন থেকে সাবধান হতে হবে। কাপ্তাই হ্রদভিত্তিক যেসব পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে, সেখানে প্লাস্টিকের ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, এ বিষয়ে ভাবতে হবে। পাশাপাশি পর্যটকসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন হতে হবে।
সাইফুদ্দিন রানা, সদস্য, গবেষক দল।

সাইফুদ্দিন রানা আরও বলেন, ‘এখন থেকে সাবধান হতে হবে। কাপ্তাই হ্রদভিত্তিক যেসব পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে, সেখানে প্লাস্টিকের ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, এ বিষয়ে ভাবতে হবে। পাশাপাশি পর্যটকসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন হতে হবে। কাপ্তাই হ্রদের বেশ কয়েকটি প্রজাতির মাছের পরীক্ষা করা হয়েছে। সব কটি মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট রাঙামাটি নদী উপকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার তথ্যটি শুনেছি। হ্রদে প্লাস্টিকের ব্যবহার কীভাবে কমানো যায় বা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, এ বিষয়ে কাজ করা হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের গবেষণামূলক প্রকল্পও হাতে নেওয়া হবে।’