বান্দরবান
মাতৃভাষায় শিক্ষা কাগজে আছে, বাস্তবে নেই
২০১৭ সাল থেকে শিশুদের মাতৃভাষার পাঠ্যবই দেওয়া হচ্ছে। তবে শিক্ষক না থাকায় ৯ বছরেও পাঠদান শুরু হয়নি।
বান্দরবান সদর উপজেলার ক্যমলংপাড়ার অংমেচিং মারমার মেয়ে দনুচিং মারমা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। শিশু শ্রেণি থেকে তাঁকে মাতৃভাষায় পড়াতে চেয়েছিলেন মা। বিদ্যালয় থেকে মাতৃভাষায় শিক্ষার পাঠ্যবইও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পাঠদান করার শিক্ষক নেই। পাঠ্যবইগুলো বাড়িতেই পড়ে রয়েছে।
অংমোচিং মারমা বলেন, ‘খুব ইচ্ছা ছিল মেয়ে মারমা ভাষায় পড়তে–লিখতে শিখবে। বই দেওয়া হলেও শিক্ষকেরা নিজেরাই পড়াতে পারেন না। তাই মাতৃভাষায় পড়াও হচ্ছে না।’
কেবল দনুচিং মারমা নয়, তিন পার্বত্য জেলার চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কোনো শিশুই এখন পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ পায়নি। ঘরে পাঠ্যপুস্তক থাকলেও সে বই পড়ানোর মতো শিক্ষক নেই। অভিভাবকেরা চাইলেও বর্ণমালা না চেনায় শিশুরা পড়তে পারছে না। ২০১৭ সাল থেকে মাতৃভাষার পাঠ্যবই দেওয়া হলেও গত ৯ বছরেও এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি।
বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার পাঠ্যবইয়ে পাঠদান চালু করতে না পারা প্রসঙ্গে শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, বিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত শিক্ষকেরা মূলধারার সাধারণ শিক্ষার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষিত। তাঁরা মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা ভাষায় প্রণীত পাঠ্যবই পড়তে পারেন না। হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষক নিজের ভাষায় লিখতে ও পড়তে পারেন। কিন্তু বিদ্যালয়ে পাঠদান করার মতো প্রশিক্ষণ তাঁদের নেই। কিছু মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিক্ষককে জেলা পরিষদ থেকে এক সপ্তাহ থেকে দশ দিন নিজ ভাষায় পাঠদানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। সেটিও যথেষ্ট ছিল না বলে পাঠদানে অগ্রগতি হয়নি।
আমার বিদ্যালয়ে মারমা শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে এবং মারমা শিক্ষকেরা পাঠদান করেন। শিক্ষকেরা মাতৃভাষায় লিখতে-পড়তে পারেন না। এ জন্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শিশুরা মাতৃভাষায় পড়তে পারছে না।মংচিং অং মারমা, প্রধান শিক্ষক, কাইন্তারমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রোয়াংছড়ি উপজেলা।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মতে, পাঠদান করতে হলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ শাখার মাধ্যমে শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তখনই কেবল মাতৃভাষার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এরপর জনসংখ্যার বিন্যাস জরিপ (কোন জনগোষ্ঠীর বসবাস কোথায় বেশি ও কম), বিদ্যালয়ের অবকাঠামো অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষের বিন্যাস ও শিক্ষার উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এসব প্রস্তুতিমূলক কাজ না হওয়ায় পাঠদান কার্যক্রমও শুরু করা যাচ্ছে না জানান শিক্ষকেরা।
জাতীয় শিক্ষাক্রম পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) পাহাড় ও সমতলে তিনটি করে ছয়টি জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করেছে। ২০১৭ সাল থেকে তিন পার্বত্য জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণির চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা শিশুদের মাতৃভাষার পাঠ্যবই দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিন পার্বত্য জেলায় চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে তিন জনগোষ্ঠীর ৬৬ হাজার ৬৮৭ শিশুকে মাতৃভাষার পাঠ্যবই দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে চাকমা শিশু ৩৫ হাজার ১৪৫ জন, মারমা ১৮ হাজার ৫১৩ ও ত্রিপুরা ১২ হাজার ৭৫৬ জন। শিক্ষকেরা জানালেন, এ বছর শিশু থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সপ্তাহে চার দিন একটি করে বিষয়ে মাতৃভাষায় পাঠদানের জন্য ক্লাস রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণির জন্য রুটিনে সপ্তাহে মাত্র এক দিনে একটি বিষয় দেওয়া হয়েছে। লামা পৌরসভার নুনারবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহেদ সরোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, রুটিনে রাখা হলেও পাঠদান কীভাবে হবে, কারা করবে, তা বলা হয়নি। তাই রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
রোয়াংছড়ি উপজেলার কাইন্তারমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মংচিং অং মারমা জানিয়েছেন, ‘আমার বিদ্যালয় এলাকায় মারমা ছাড়া কোনো জনগোষ্ঠী নেই। বিদ্যালয়েও শুধু মারমা শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে এবং মারমা শিক্ষকেরা পাঠদান করেন। শিক্ষকেরা মাতৃভাষায় লিখতে-পড়তে পারেন না। এ জন্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শিশুরা মাতৃভাষায় পড়তে পারছে না।’
বান্দরবানের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পরিণয় চাকমা জানিয়েছেন, তিন পার্বত্য জেলায় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ জেলা পরিষদে ন্যস্ত। মূলধারার সাধারণ শিক্ষাসহ মাতৃভাষায় শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে সার্বিক পরিকল্পনা নিয়ে জেলা পরিষদগুলোকে ভূমিকা রাখতে হবে। এই উদ্যোগে কাজ করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। এবার মাতৃভাষায় পাঠদানের রুটিনে অন্তর্ভুক্ত এক ধাপ অগ্রগতি হয়েছে। কাজ শুরু হয়েছে, এভাবে ধীরে ধীরে অগ্রগতি হবে।