কাটা ডালে নতুন কুঁড়ি, আবার সবুজ হচ্ছে কৃষ্ণচূড়ার সড়ক
দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজের দীর্ঘ এক করিডর। সড়কের দুই পাশে সারি সারি কৃষ্ণচূড়াগাছ। ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছে সড়কের ওপর। কোথাও গাছের ছায়ায় তৈরি হয়েছে নিরিবিলি পরিবেশ। ব্যস্ত নগরের মধ্যে এই সড়ক যেন এক টুকরা সবুজ পথ।
রাজশাহী নগরের দায়রাপাক মোড় থেকে নাদের হাজীর মোড় পর্যন্ত সড়কটির এই চিত্র কয়েক মাস আগেও ছিল অনেকটাই বিবর্ণ। ওয়াসার (পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ) পাইপলাইন স্থাপনের কাজ করতে গিয়ে সড়কের এক পাশের প্রায় ১০০টি কৃষ্ণচূড়াগাছের ডালপালা কেটে ফেলা হয়েছিল। ডালপালা হারিয়ে গাছগুলো যেমন বিবর্ণ হয়ে পড়েছিল, তেমনি বদলে গিয়েছিল সড়কের চেহারাও। শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, গাছগুলো আদৌ টিকে থাকবে কি না।
সিটি করপোরেশনের অনুমতি ছাড়া কেউ গাছের একটি ডালও কাটতে পারেন না। বিদ্যুৎ বিভাগ মাঝেমধ্যে গাছের ডাল কাটে। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করা দরকার।মো. ফরহাদ হোসেন, ব্যবস্থাপক, পরিবেশ শাখা, রাজশাহী সিটি করপোরেশন
গত সোমবার দুপুরে সড়কের পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে পরিবর্তন। কেটে ফেলা ডাল থেকে বের হয়েছে নতুন শাখা। গজিয়েছে কচি পাতা। কোথাও নতুন ডালপালা বেশ ঘন হয়েছে, কোথাও কাণ্ড থেকে বের হওয়া শাখা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। কয়েক মাসের ব্যবধানে গাছগুলো যেন আবার সবুজ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। সড়কের দক্ষিণ পাশের যেসব গাছের ডালপালা কেটে ফেলা হয়েছিল, সেগুলোতেও নতুন ডাল ও পাতা গজিয়েছে। ধীরে ধীরে পূরণ হচ্ছে সেই শূন্যতা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাজশাহী ওয়াসার পানি শোধনাগার প্রকল্পের পাইপলাইন বসানোর কাজ চলার সময় এসব গাছের ডালপালা কাটা হয়। ভারী পাইপ ওঠানো-নামানোর কাজে ব্যবহৃত ক্রেন চলাচলের সময় গাছের ডাল বাধা সৃষ্টি করছিল। এ কারণে ডাল কাটা হয়েছিল বলে তখন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছিলেন।
দায়রাপাক মোড় থেকে নাদের হাজীর মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে থাকা কৃষ্ণচূড়াগাছগুলো ২০১৯ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন রোপণ করেছিল। কয়েক বছরের মধ্যেই গাছগুলো বড় হয়ে ওঠে। ডালপালা সড়কের ওপর ছড়িয়ে পড়ে তৈরি হয়েছিল ছায়াঘেরা পরিবেশ। ডাল কাটার পর সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে যায়। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশকর্মী ও নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে ডাল কাটার পর একটি গাছ মারা গেছে। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন কয়েকটি গাছের ডালও কেটেছেন বলে জানা গেছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পরিবেশ শাখার ব্যবস্থাপক ফরহাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সিটি করপোরেশনের অনুমতি ছাড়া কেউ গাছের একটি ডালও কাটতে পারেন না। বিদ্যুৎ বিভাগ মাঝেমধ্যে গাছের ডাল কাটে। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করা দরকার। চিঠি দিয়ে জানালে সিটি করপোরেশনের লোকজন উপস্থিত থেকে কতটুকু ডাল কাটা প্রয়োজন, তা দেখিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু অনেক সময় পুরো ডালপালা কেটে ফেলা হয়।
কৃষ্ণচূড়াগাছগুলোর নিচে অনেক মানুষ বসেন ও বিশ্রাম নেন উল্লেখ করে রাজশাহী বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশনকে এ বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
সড়কের ফুটপাতের পাশে চা বিক্রি করেন তাইজুল ইসলাম। তিনি বলেন, সড়কের সৌন্দর্য দেখতে এখানে অনেক মানুষ আসেন। গাছের ডাল কাটার পর মানুষের আনাগোনা কমে গিয়েছিল। এখন গাছগুলো আবার বড় হচ্ছে। একসময় সড়কের ওপর ছায়া ফেলবে, মানুষও আবার এসে বসবে।
সড়কের আশপাশে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু খাবারের দোকান। রয়েছে পাঁচটি টার্ফ মাঠও (কৃত্রিম ঘাস বা সিন্থেটিক ফাইবার বিছানো খেলার মাঠ)। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, সড়কটির পরিবেশ ও সৌন্দর্যের সঙ্গে তাঁদের ব্যবসারও সম্পর্ক রয়েছে। গাছের ছায়াঘেরা পরিবেশে মানুষের আনাগোনা বাড়লে আশপাশের ব্যবসাতেও তার প্রভাব পড়ে।
পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরতে গাছগুলোর আরও সময় লাগবে। নতুন ডালপালা এখনো আগের বিস্তৃত ছায়া তৈরি করতে পারেনি। তবু কাটা ডালের জায়গা থেকে বের হওয়া কচি পাতা ও নতুন শাখাগুলো যেন পুরোনো সবুজের ফিরে আসার বার্তা দিচ্ছে। নগরবাসী ও পরিবেশকর্মীদের প্রত্যাশা, উন্নয়নকাজের পাশাপাশি গাছের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে ডাল কাটা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়বে।