সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানার দুই শ্রমিকের লাশ উদ্ধার
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরা নৌঘাট এলাকায় সাগর উপকূল থেকে দুই ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে একজনের লাশ খণ্ডবিখণ্ড অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। নিহত দুজনই স্থানীয় একটি জাহাজভাঙা কারখানার শ্রমিক। আজ সোমবার সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল তাঁদের লাশ উদ্ধার করে।
দুই শ্রমিকের নিহতের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, ডাকাতের হামলায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে শিল্প পুলিশের দাবি, কারখানায় নতুন জাহাজ তোলার সময় (বিচিং) দুর্ঘটনায় দুই শ্রমিকের প্রাণহানি হয়েছে।
নিহত শ্রমিকেরা হলেন— সাইফুল ইসলাম ও আবদুল খালেক। তাঁদের দুজনেরই বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়। এর মধ্যে সাইফুলের লাশটি খণ্ডবিখণ্ড অবস্থায় ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার করে।
ফায়ার সার্ভিসের কুমিরা স্টেশনের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা আল মামুন জানান, নিহত দুজনই কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড নামে একটি জাহাজভাঙা কারখানার শ্রমিক। কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাতে ওই শ্রমিকেরা একটি নৌকা (লাল বোট) নিয়ে উপকূলের কারখানাটি পাহারা দিচ্ছিলেন। কারখানাটিতে একটি ডাকাতদল মালামাল লুট করতে এলে ওই শ্রমিকেরা তাঁদের প্রতিরোধ করতে যান। এ সময় ডাকাতদলের ধারালো অস্ত্রের কোপে একজনের দেহ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে। বাকি শ্রমিকেরা এ সময় নৌকা থেকে সাগরে লাফ দিলে সেখানে আরও এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আল মামুন আরও বলেন, ‘দুই শ্রমিকের লাশ উদ্ধারের পাশাপাশি আশরাফুল ইসলাম ও রুবেল হাসান নামের অপর দুই শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় সকালে উদ্ধার করা হয়েছে।’
এদিকে কারখানা কর্তৃপক্ষের বরাতে ডাকাতদলের হামলায় ওই দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে জানালেও ভিন্ন দাবি করেছে পুলিশ, জাহাজভাঙা শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, জাহাজভাঙা কারখানাটিতে নতুন একটি জাহাজ তোলার সময় দুর্ঘটনায় দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ওই শ্রমিকেরা যে নৌকায় ছিলেন জাহাজটির ধাক্কায় সেটি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এ সময় দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
শিল্প পুলিশের পরিদর্শক নাহিদ হাসান মৃধা প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে জাহাজ বিচিং করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। এতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি আরও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) চট্টগ্রাম সেন্টারের সমন্বয়কারী ফজলুল কবির বলেন, ঘন কুয়াশায় বিচিং করার সময় জাহাজটি লাল বোটের ওপর তুলে দেয়। এ সময় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। হংকং কনভেনশন অনুযায়ী বিচিং করার আগেই নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল। এ বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি স্পষ্ট।
জানতে চাইলে কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের কর্ণধার তসলিম উদ্দিনও দাবি করেন ডাকাতদলের হামলায় দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কারখানায় দেড় মাস ধরে কোনো জাহাজ ভাঙা হচ্ছে না। সম্প্রতি একটি জাহাজ এসেছে, তবে সেটি ভাঙার অনুমতি এখন পর্যন্ত মেলেনি। যার কারণে কোনো কাজ চলমান নেই। এটি জাহাজ–সংক্রান্ত কোনো দুর্ঘটনা নয়।’
বিলসের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে মোট ৪৮টি দুর্ঘটনায় ৫৮ জন শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার প্রায় ৬৩ শতাংশই ছিল মারাত্মক, যেখানে শ্রমিকদের হাত-পা কাটা বা থেঁতলে যাওয়া, হাড় ভাঙা, মাথা-চোখ-বুকে গুরুতর আঘাত, আগুন ও বিস্ফোরণে দগ্ধ হওয়া এবং স্থায়ী অঙ্গহানির মতো পরিণতি ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর দুর্ঘটনার মধ্যে ৩০টি ছিল মারাত্মক, ১৪টি হালকা এবং ৪টি ঘটনায় একাধিক শ্রমিক একসঙ্গে আহত হয়েছেন। কাজের ধরন ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে একই ইয়ার্ডে একাধিক শ্রমিক একসঙ্গে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
বিলসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দিনের বেলায় সংঘটিত দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ২৯, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৬০ শতাংশ। এসব দুর্ঘটনার প্রধান ক্ষেত্র ছিল ভারী লোহার কাজ, কাটিং ও লোডিং কার্যক্রম। রাতের বেলায় ১৯টি দুর্ঘটনা (প্রায় ৪০ শতাংশ) ঘটেছে, যেখানে আলোর স্বল্পতা, শ্রমিকদের অতিরিক্ত ক্লান্তি ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারী লোহা বা গার্ডার পড়ে আঘাতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৩৫ শতাংশ। এরপর আগুন ও গ্যাস বিস্ফোরণ ২০ শতাংশ। উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া ও যন্ত্রপাতিজনিত দুর্ঘটনা প্রায় ১৫ শতাংশ করে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মোট দুর্ঘটনার ৭০ শতাংশের বেশি ঘটেছে কাটার হেলপার, কাটারম্যান, ফিটারম্যান ও ওয়্যার গ্রুপের শ্রমিকদের মধ্যে। বিশেষ করে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুম ও কাজের চাপ বৃদ্ধির সময় দুর্ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্প আছে শুধু সীতাকুণ্ডে। আটকে পড়া একটি জাহাজ কাটার মাধ্যমে ১৯৬৫ সালে এই শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। একসময় এখানে কমবেশি দেড় শতাধিক জাহাজভাঙা কারখানা থাকলেও এখন এই সংখ্যা কমেছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৪১টি ইয়ার্ড পুরোনো জাহাজ আমদানি করেছে। অর্থাৎ সচল থাকা জাহাজভাঙা কারখানার সংখ্যা ৪১। এর মধ্যে ২৩টি গ্রিন ইয়ার্ড।