দুবাইয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত বড়লেখার প্রবাসীর দাফন সম্পন্ন
বুকে শোকের পাথর নিয়ে এই কদিন অপেক্ষায় ছিলেন স্ত্রী, সন্তান ও নিকটজন। কখন প্রবাসী সালেহ আহমদের লাশ দেশে আসবে। একটিবার অন্তত শেষবারের মতো চোখের দেখা দেখবেন তাঁকে। প্রায় এক সপ্তাহ পর সরকারি ব্যবস্থাপনায় এই প্রবাসীর লাশ তাঁর নিজ বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। চার মাস আগে এই বাড়ি থেকেই তিনি জীবিত প্রবাসে ফিরে গিয়েছিলেন।
সোমবার বেলা সোয়া তিনটার দিকে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার গাজীটেকা (বাঁশতলা) গ্রামে লাশবাহী গাড়িতে করে সালেহ আহমদের লাশ এসে পৌঁছায়। এ সময় বাড়িতে কান্নার রোল ওঠে। কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী, পুত্র-কন্যাসহ আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশীরা। স্বজনদের আহাজারিতে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পাড়াপ্রতিবেশীসহ স্থানীয় মানুষ বাড়িতে এসে ভিড় করেন।
এর আগে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ওই প্রবাসীর লাশ গ্রহণ করেন। পরে তিনি লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে নিহত ব্যক্তির গ্রামের বাড়ি বড়লেখায় যান। এ সময় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে অপর ফ্লাইটে দুবাই থেকে সালেহ আহমদের ছোট দুই ভাই জাকির হোসেন ও বোরহান উদ্দিনও দেশে এসেছেন। কাজের সূত্রে বড় ভাইয়ের সঙ্গে তাঁরাও দুবাইয়ের আজমান শহরে অবস্থান করছিলেন। জাকির হোসেন প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘গতকাল আমরা দুবাই থেকে এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে দেশে এসেছি। ভাইয়ের লাশ সরকারিভাবে নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা দুই ভাই এসেছি ব্যক্তিগত উদ্যোগে।’
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩৫ বছর ধরে দুবাই ছিলেন মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সালেহ আহমদ। দেশে এ নামে পরিচিত হলেও প্রবাসে তাঁর নাম হচ্ছে আহমদ আলী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইফতারের পর রাতে পানি সরবরাহের কাজে বের হলে দুবাইয়ের আজমান শহরে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র তাঁর গাড়িতে আঘাত করে। এ ঘটনায় তিনি মারা যান। তিনি পানির ট্যাংকার চালনা করতেন। সালেহ আহমদের বাড়ি বড়লেখা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাজীটেকা গ্রামে। তিনি গাজীটেকা গ্রামের মৃত সবর আলীর ছেলে। তাঁর স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে দেশেই থাকেন।
এদিকে সোমবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে সালেহ আহমদের নিজ গ্রাম গাজীটেকার শাহী ঈদগাহে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গ্রামের কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। জানাজায় শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নিয়ামত উল্লাহ, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন, বড়লেখার ইউএনও গালিব চৌধুরী প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন। সরকারের সহায়তায় এক সপ্তাহ পর সালেহ আহমদের লাশ দেশে নিয়ে আসায় তাঁর আত্মীয়স্বজন ও এলাকার মানুষ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
তাৎক্ষণিকভাবে নিহত প্রবাসী সালেহ আহমদের পরিবারকে শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে নগদ ৮৫ হাজার টাকা এবং বড়লেখা উপজেলা পরিষদ থেকে ২০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, ‘ঘটনার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সার্বক্ষণিক খবরাখবর নিয়েছেন। আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। আমরা লাশ বহন করে নিয়ে এসেছি। সরকারি প্রক্রিয়ায় সবকিছু সম্পন্ন করে তাঁর পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।’
মন্ত্রী জানিয়েছেন, সালেহ আহমদের এক ছেলে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত, তাঁর চিকিৎসায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। স্ত্রী প্রতিবন্ধী, তাঁকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে এবং তাঁর বড় ছেলের কর্মসংস্থানের কী ব্যবস্থা করা যায়, সেটা দেখা হবে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিবারের খোঁজখবর রাখা হবে।
আরিফুল হক বলেন, ‘যুদ্ধে নিহত চারজনের মধ্যে একজনের লাশ দেশে নিয়ে এসেছি। সবাইকে দেশে নিয়ে আসা হবে। যুদ্ধের কারণে যাঁরা আহত হয়েছেন, তাঁদের চিকিৎসা চলছে। যুদ্ধাবস্থায় খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যুদ্ধাবস্থায় নিরাপদ রাখতে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রবাসীদের পাশে আমাদের সরকার আছে, প্রবাসীদের পাশে সরকার থাকবে।’