যমুনার তীরে মাথা তুলছে ‘সবুজ’ অর্থনৈতিক অঞ্চল

এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে মোট ৪০০ প্লট হবে। পর্যায়ক্রমে এখানে পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পুরো প্রকল্প সবুজ রাখতে মোট জমির ৬০ শতাংশ কারখানার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। 

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম পাড়ে যমুনা নদীর তীরে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম শতভাগ সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চল
ছবি: প্রথম আলো

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পারে যমুনা নদীর তীরে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম শতভাগ সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চল। পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না করে সেখানে আধুনিক শিল্পনগরীর সুযোগ-সুবিধাসহ দক্ষ জনগোষ্ঠীর বাসস্থান ও কর্মসংস্থান গড়ে উঠবে। কর্তৃপক্ষের আশা, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শেষ হলে পর্যায়ক্রমে এখানে পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। 

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, সিরাজগঞ্জে অর্থনৈতিক অঞ্চল ‘প্লাটিনাম গ্রিন কনসেপ্টে’ গড়ে উঠবে। সেখানে গ্রামীণ জীবনের স্বকীয়তা বজায় রেখে উন্নয়নের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে কর্ম, শিল্প ও মানুষ।

বায়ু ও পানিদূষণমুক্ত সুস্থ পরিবেশে গড়ে উঠবে দক্ষ ও উৎপাদনক্ষম একটি জনগোষ্ঠী। ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে বেসরকারি খাতে ব্যাপক শিল্পায়নের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে বেজা সর্বাত্মক সহায়তা করতে প্রস্তুত। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত এই বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল সিরাজগঞ্জ জেলার আর্থসামাজিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন করবে, যার ছোঁয়া লাগবে সমগ্র উত্তরাঞ্চলে। 

সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বেজা ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে চূড়ান্ত নিবন্ধন দেয়। নয়টি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ও দুই ব্যক্তি উদ্যোক্তা যৌথভাবে এর মালিকানায় আছেন। ১ হাজার ৪১ দশমিক ৪৪ একর জায়গায় এ অঞ্চল গড়ে উঠছে। নির্মাণাধীন এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভূমি উন্নয়নের ৬০ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে দেশি ও বিদেশি ১৪টি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে ১১০ একর জমি বরাদ্দ নিয়েছে। বাকি জমির জন্য সৌদি আরব, জাপান, চীন, আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, নরওয়েসহ কয়েকটি দেশের বিনিয়োগকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে ভূমি উন্নয়নের কাজে প্রকৌশলগত সহায়তা দিচ্ছে জাপান ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (জেডিআই)।

অর্থনৈতিক অঞ্চলটির ভূমি উন্নয়নের ৬০ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে
ছবি: প্রথম আলো

সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিচালক শেখ মনোয়ার হোসেন জানান, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে মোট ৪০০ প্লট হবে। ওই প্লটগুলোতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে পর্যায়ক্রমে এখানে পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। স্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান ভূমি বরাদ্দ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এটি দেশের প্রথম সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ায় তাঁরা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষায় রয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ১৪টি প্রতিষ্ঠান বস্ত্র, তৈরি পোশাক, ডাইং ফ্যাক্টরি, সুতা উৎপাদন, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ পণ্য ও ইলেট্রিক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্লট বরাদ্দ পেয়েছে।

সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে শেখ মনোয়ার হোসেন বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণের শুরু থেকে কারখানা স্থাপন, পণ্য পরিবহন, শিল্প–সংশ্লিষ্ট কর্মীদের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ সব স্তরেই সবুজ পরিবেশ–পরিস্থিতির মানদণ্ড বজায় রাখা হবে। পুরো প্রকল্পটি সবুজ রাখতে মোট জমির ৬০ শতাংশ কারখানার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। বাকি জমিতে খেলার মাঠ, জলাধার, বনায়ন, বিনোদন কেন্দ্র, হাসপাতাল, কারিগরি ইনস্টিটিউট, কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি), রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম, সোলার প্যানেল পার্কসহ নানা অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত সব প্রতিষ্ঠান শতভাগ সারফেস ওয়াটার বা ভূমির উপরিভাগের পানি ব্যবহার করবে। যমুনা নদী থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি তুলে কারখানায় দেওয়া হবে। কারখানায় ব্যবহৃত ওই পানি এবং সিইটিপির মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহারোপযোগী করে তোলা হবে। বৃষ্টির পানি ধারণ করে রেখে তা সারা বছর ব্যবহারের জন্য রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম স্থাপন করা হবে। বায়ু ও শব্দদূষণ থেকে রক্ষার জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

মনোয়ার হোসেন বলেন, সম্পূর্ণ সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পাশাপাশি স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ শতভাগ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স (পিডব্লিউসি) ও জাপান ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (জেডিআই) একসঙ্গে একটি নকশা (ডিটেইলড প্ল্যান) প্রস্তুত করেছে।

মনোয়ার হোসেন  বলেন, ‘আমাদের যে মহাপরিকল্পনা রয়েছে, তাতে এ কারখানায় পরিবেশদূষণের কোনো সুযোগ থাকবে না। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় হয় এমন সুযোগ রাখা হবে না। প্রাকৃতিকসম্পদ শতভাগ ব্যবহারের প্রযুক্তি থাকবে। দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতশিল্পের অন্তর্ভুক্ত করতে কৃষিভিত্তিক  ইন্ডাস্ট্রিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্লট বরাদ্দের পরিকল্পনা সাজিয়েছে সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোন। আমরা প্রথমত বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ চাই। সৌদি, জাপান, চীন, আমেরিকাসহ কয়েকটি দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি। পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো শেষ হলে অনেক বেশি সাড়া পাব। ফলে এই মুহূর্তে বরাদ্দ দেওয়া বন্ধ রয়েছে।’

মনোয়ার হোসেন আরও বলেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে এখানে নদীবন্দর হচ্ছে। চার লেনের রাস্তা হচ্ছে। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে তিন-চার ঘণ্টায় অর্থনৈতিক অঞ্চলে পৌঁছানো যাবে। সেখানে সড়ক, রেল, বিমান ও নদীপথে যাতায়াতের জন্য সহজ। দেশের ১৬টি জেলা নিয়ে গঠিত উত্তরবঙ্গে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান না থাকায় সহজেই কর্মী পাবেন শিল্পোদ্যোক্তারা। পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় ঢাকার চেয়ে কম থাকাটাও একটি বড় সুযোগ। এর সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সহজ প্রাপ্তি আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে। এতে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হবে সিরাজগঞ্জ।

সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে এ পর্যন্ত ১১০ একর জমি ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে সিরাজগঞ্জ ইজেড অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড (৫ একর), কন্টিনেন্টাল গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেড (৮ একর), ডায়নামিক ড্রেজিং (২ একর), নিট এশিয়া লিমিটেড (৮ একর), এমকে কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (৪ একর) রাতুল ফেব্রিক লিমিটেড (৫ একর), অ্যাকটিভ কম্পোজিট মিলস লিমিটেড (২ একর), রাইজিং হোল্ডিংস লিমিটেড (১০ একর), রাইজিং স্পিনিং মিলস লিমিটেড (৫ একর), যশোর ফিড লিমিটেড (১৬ একর), মেরিনা প্রপার্টিজ (বিডি) লিমিটেড (২১ একর), টেক্সট টাউন লিমিটেড (৫ একর), স্কয়ার এক্সেসরিজ লিমিটেড (১২ একর) ও স্কয়ার ইলেকট্রনিকস লিমিটেড (৭ একর)।

অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘আমরা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ পণ্য (সহযোগী শিল্প) তৈরি করব। আমাদের কাঁচামালের সংকট রয়েছে। সেটি জুতার জন্য হোক কিংবা ব্যাগ তৈরির জন্য। পরিবেশবান্ধব কারখানা তৈরি করে দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসার জন্য এখানে প্লট নিয়েছি।’

সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলের চেয়ারম্যান মতিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বস্ত্র, তৈরি পোশাক, পাটজাত দ্রব্য, ওষুধ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কাগজ, আসবাবসহ নানা ধরনের পণ্য উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ প্রস্তাব আসছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য বিদ্যুৎ, পানিসহ অন্যান্য পরিষেবা নিশ্চিত করা হবে। সব মিলিয়ে এটি একটি বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।