শুধুই চারা বিতরণ নয়, গাছ বাঁচানোর দায়িত্বও নেন কুষ্টিয়ার এই চিকিৎসক
গাছের চারা বিতরণের আগে দেওয়া হয় প্রশিক্ষণ। চারা লাগানো, সার-মাটি প্রয়োগ, গাছের যত্ন নেওয়া—সবই হাতে-কলমে শেখানো হয়। বিতরণ করা চারা রোপণ করেই কাজ শেষ না। নিয়মিত তদারক করা হয়। এরপরও গাছ মরে গেলে বা নষ্ট হলে সেখানে আরেকটি চারা রোপণ করা হয়।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় সবুজায়ন করতে এমন উদ্যোগ নিয়েছেন এ এস এম মুসা কবির নামের এক চিকিৎসক। গত তিন বছরে তাঁর উদ্যোগে ১১ হাজার ৬৯৯টি চারা রোপণ ও বিতরণ করা হয়েছে। এই কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করতে স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘স্মাইল ফর অল’ নামের একটি সংগঠন।
মুসা কবির কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক। তাঁর বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় দাড়েরপাড়া গ্রামে। কুষ্টিয়া শহরে বসবাস করলেও প্রতি মঙ্গলবার তিনি সময় করে গ্রামে যান। গাছ লাগানো ও তদারক করেন। সবুজায়নের পাশাপাশি স্থানীয় নারীদের স্বাবলম্বী করতে সেলাই প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেছেন। গত এক বছরে তাঁর উদ্যোগে ২০০ শতাধিক নারী সেলাই প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
সরেজমিনে একদিন
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের কৈপাল-হিসনাপাড়া সড়কে ২০২৪ সালে রোপণ করা ১০০টি আম্রপালি আমগাছের মধ্যে প্রায় ৩০টি গাছে এবার ফল ধরেছে। স্থানীয় বাসিন্দা হারুনোর রশিদ বলেন, তাঁর বাড়ির সামনে লাগানো একটি গাছ থেকে এবার তিনি ১৭টি আম পেয়েছেন। তিনি জানান, রাস্তার পাশের গাছে ফল ধরতে দেখে আশপাশের অনেক পরিবার এখন নিজেরাই ফলদ গাছ লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করছে।
হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের জয়রামপুর-বেগুনবাড়ি সড়কে রোপণ করা প্রায় ৭০০ সুপারিগাছ বেড়ে উঠছে। একই সড়কে লাগানো ১৫টি আমগাছের মধ্যে ১৪টিই জীবিত রয়েছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক আবু সুফিয়ান বলেন, গাছগুলো নিয়মিত পরিচর্যা করা হচ্ছে। স্থানীয় মানুষও সহযোগিতা করছেন।
২০২৩ সালে শশীধরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তারাগুনিয়া-শশীধরপুর সড়কে ‘স্মাইল ফর অল’ থেকে পাওয়া আমগাছ রোপণ করেছিলেন। এবার বেশির ভাগ গাছে দ্বিতীয়বারের মতো মুকুল এসেছে। পথচারী আল আকসার জানান, গাছগুলো এখন বেশ বড় হয়ে গেছে এবং তিনি নিজেই রাস্তার পাশের গাছ থেকে এবার আটটি আম খেয়েছেন।
এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, চারা রোপণের পর অনেকেই আর খোঁজখবর রাখেন না। কিন্তু মুসা কবির নিজে দলবল নিয়ে এসে পরিচর্যা করেন। এলাকার স্কুল-কলেজ, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে গাছ বিতরণ ও রোপণ করেন।
উপজেলার নাসির উদ্দিন বিশ্বাস বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ লিয়াকত আলী বলেন, তাঁরা গাছ রোপণের পর যেভাবে পরিচর্যা করছেন, তাতে একটি গাছও মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। গাছ লাগোনোর পর সার, পানি দেওয়াসহ সব পরিচর্যা করে থাকেন। বিষয়টি এলাকায় সাড়া ফেলেছে।
‘স্মাইল ফর অলের’ উদ্যোগে ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৯৯টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। একই সময়ে মোট ৭ হাজার ৩০০টি চারা বিতরণ করা হয়েছে।
শুরুর কথা
পরিবেশ বিপর্যয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ রোধ, ফলের গাছ বাড়িয়ে পুষ্টির চাহিদা মেটানোর ভাবনা থেকে ২০২৩ সালের ১ জুলাই নিজের অর্থায়নে কাজ শুরু করেন মুসা কবির। তাঁর মতে, ফলদ গাছ মানুষ, পশুপাখি এবং পরিবেশ—তিন ক্ষেত্রেই উপকার করে। মানুষ ফল পায়, পাখি খাদ্য পায়, পরিবেশ সবুজ হয়। একই সঙ্গে ফলদ গাছ মানুষ সহজে কাটতে চায় না। কারণ, গাছটি ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও খাদ্যগত মূল্য তৈরি করে। পাশাপাশি বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানো শুরু করেন।
গাছ লাগানোর পর যাতে কোনো মানুষ ও পশু নষ্ট না করে, সে জন্য নিয়মিত পরিচর্যার (সার, মাটি) জন্য অর্ধশতাধিক তরুণকে নিয়ে ‘স্মাইল ফর অল’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলেন। সংগঠনের সভাপতি আকাশ বিশ্বাস বলেন, দলের তরুণেরা প্রতিটি গাছ রোপণের পর নিয়মিত তদারক করেন। খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পাইপ ও পলিথিন পেঁচিয়ে দেওয়া হয়, যাতে গবাদিপশু ক্ষতি করতে না পারে। এরপর কীটনাশক স্প্রে করা হয়। গরমের সময় পানিও দেওয়া হয়।
মুসা কবির সাধারণ মানুষদের নিয়ে সভা-সেমিনারও করেন। গাছ লাগানোর গুরুত্ব নিয়ে সেখানে নিজের কথা তুলে ধরেন। এলাকার মানুষ ছাড়াও শিক্ষার্থীরা সেখানে আসেন। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরা কথা বলার জন্য আসেন।
চারা বিতরণে ‘প্ল্যান্ট হাব’
উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের আল্লারদর্গা এলাকায় একটি ‘প্ল্যান্ট হাব’ গড়ে তুলেছেন মুসা কবির। সেখানে বিভিন্ন নার্সারি থেকে নানা জাতের গাছের চারা এনে রাখা হয়। এরপর প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে আবেদনপত্র (চাহিদা) নেওয়া হয়। সেই চাহিদা অনুযায়ী গাছ বিতরণ করা হয়। গাছের চারা নেওয়ার পর সেগুলো ঠিকমতো রোপণ ও পরিচর্যা করা হচ্ছে কি না, সেটি পর্যবেক্ষণ করেন টিমের সদস্যরা।
সংগঠনের সদস্যরা জানান, এখানে কাঠগোলাপ, জবা, আম, আমড়া, কাঠবাদাম, চালতা, লাল পেয়ারা, থাই পেয়ারা, নিম, কতবেল, কামরাঙাগাছ রয়েছে। চলতি বছর এই হাব থেকে প্রায় ৩ হাজার নানা জাতের গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে।
সংগঠনটির হিসাবে ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৯৯টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে মোট ৭ হাজার ৩০০টি চারা বিতরণ করা হয়েছে।
‘স্মাইল ফর অলের’ সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ বোখারি বলেন, মুসা কবিরের অর্থায়নে গাছ কেনা, বিতরণ ও রোপণের কাজ চলমান আছে। দৌলতপুর উপজেলার সব ইউনিয়নে পরিধি বাড়ানো হচ্ছে।
বিনা মূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ
গাছ লাগানোর পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করতে বিনা মূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ চালু করেছেন মুসা কবির। ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল রিফায়েতপুর ইউনিয়নের হরিণগাছি মোল্লাপাড়ায় ১৭ জন নারী শিক্ষার্থী নিয়ে প্রথম ব্যাচের যাত্রা শুরু হয়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে সেলাই প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত প্রশিক্ষক আরিফা আবেদিন প্রশিক্ষণ দেন। এ পর্যন্ত ৮টি ব্যাচে প্রায় ২০০ নারী বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণে ব্যবহারিক পোশাক ও গৃহস্থালি পণ্য তৈরির কাজ শেখানো হয়। প্রতিটি ব্যাচের সেরা একজন প্রশিক্ষণার্থীকে একটি করে সেলাই মেশিন এবং অংশগ্রহণকারীদের সেলাই উপকরণ দেওয়া হয়।
তাঁরা গাছ রোপণের পর যেভাবে পরিচর্যা করছেন, তাতে একটি গাছও মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। গাছ লাগোনোর পর সার, পানি দেওয়াসহ সব পরিচর্যা করে থাকেন। বিষয়টি এলাকায় সাড়া ফেলেছে।
প্রশিক্ষণ শেষে অনেক শিক্ষার্থী পোশাক তৈরি করে নিজস্ব আয় শুরু করেছেন। তাঁদের জন্য এখনো একটি ফ্রি হেল্পলাইন চালু রয়েছে, যাতে কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যা হলে প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া যায়।
ফিলিপনগর ইউনিয়নের চর সাধীপুরের বাসিন্দা গৃহবধূ রুনা বেগম বলেন, ‘বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আমার মতো আরও নারীরা স্বাবলম্বী হতে পারবে।’
চিকিৎসক এ এস এম মুসা কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাছ বাড়লে পরিবেশ ভালো থাকবে। পরিবেশ ভালো থাকলে মানুষের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। ফলের গাছ বাড়লে মানুষের পুষ্টির চাহিদা মিটবে। এসব ভাবনা থেকেই এমন উদ্যোগ নিয়েছি। সব ধরনের মানুষ আমাকে সহযোগিতা করছেন। আগামী দিনে আরও বেশি বেশি গাছ লাগানো হবে। ইচ্ছা আছে গাছের সংখ্যা লাখ পূরণ করব।’