আঙুলের ছাপ জালিয়াতি করে অন্যের সিম তুলে নগদ-বিকাশের টাকা সরিয়ে নিতেন তাঁরা

আঙুলের ছাপ জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের মুঠোফোনের সিম তুলে অর্থ হাতানো চক্রের সদস্যরা। আজ মঙ্গলবার সকালে বাগেরহাট পুলিশ সুপার কার্যালয়ে।ছবি: প্রথম আলো

কৌশলে গ্রাহকের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করত একটি চক্র। পরে সেই ছাপের নকশা ব্যবহার করে কৃত্রিম আঙুলের ছাপ তৈরি করা হতো। ওই কৃত্রিম ছাপ দিয়ে গ্রাহকের মুঠোফোনের সিম তুলে নিজেদের ওই নম্বরে থাকা বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টের টাকা সরিয়ে নিতেন তাঁরা। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই প্রতারণা করে আসছিলেন চক্রটির সদস্যরা।

বাগেরহাট জেলা পুলিশ ও এসআরবি-১০–এর যৌথ অভিযানে এমন অভিনব প্রতারণায় জড়িত অভিযোগে এই চক্রের ৯ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে ১১টি মুঠোফোন, প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া ৮০ হাজার ৭৪০ টাকা, ফিঙ্গারপ্রিন্ট (আঙুলের ছাপ) স্ক্যানারসহ বিভিন্ন মালামাল জব্দ করা হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. জামিরুল ইসলাম নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার নলবুনিয়া এলাকার ইয়াছিন সওদাগর (২১), মোংলা উপজেলার সুন্দরবন ইউনিয়নের শামীম মেখ (২৭), বাগেরহাট সদর উপজেলার বাগদিয়া এলাকার রাশেদ মোড়ল (২০), মোরেলগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সরালিয়া এলাকার এহসানুল হাসান ওরফে রাকিব (৩২), পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার বানাতিবাজার এলাকার ফেরদাউস (২১), একই জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার ভয়াং এলাকার মো. মামুন গাজী (২১), মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ষোলআনি এলাকার আশরাফুল ইসলাম (২৬), একই উপজেলার জাইসতালা এলাকার মেহেদী হাসান (২৯) এবং বরগুনা সদর উপজেলার বালিয়াতলী এলাকার মো. নাজমুল হাসান (২০)।

পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কয়েকজন এর আগেও একই ধরনের জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

সহকারী পুলিশ সুপার (মোংলা সার্কেল) মো. রেফাতুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের ১ জুলাই মোংলা থানায় দায়ের করা সাইবার সুরক্ষা আইনের একটি মামলার তদন্ত করে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে আসামিদের শনাক্ত করা হয়। পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে নগদ-বিকাশসহ বিভিন্ন এমএফএস অ্যাকাউন্টে থাকা গ্রাহকের টাকা আত্মসাতে জড়িত। এর জন্য গ্রাহকের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করতেন চক্রটির সদস্যরা। জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারের তথ্যও বিভিন্নভাবে সংগ্রহ করে এই জালিয়াতি করতেন তাঁরা।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা গ্রাহকের আঙুলের ছাপ সংরক্ষণে অভিনব একটি কৌশল ব্যবহার করতেন। বায়োমেট্রিক ডিভাইস বা ফোনের স্ক্রিনে প্রদর্শিত ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্রিন রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে তাঁরা প্রথমে ছাপ সংগ্রহ করতেন। পরে আঙুলের ছাপের দৃশ্যমান প্যাটার্ন আলাদা করে তার ডিজিটাল প্যাটার্ন পুনরুৎপাদন করা হতো। এরপর কৃত্রিমভাবে তৈরি ওই ছাপ ব্যবহার করে সিম রিপ্লেসমেন্ট করা হতো। সিমটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ওই নম্বরের সঙ্গে যুক্ত এমএফএস অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতেন চক্রের সদস্যরা। পরে ওই অ্যাকাউন্টের পিন রিসেট করে সেখানে থাকা টাকা অন্য নম্বরে স্থানান্তর করে হাতিয়ে নিতেন।

সহকারী পুলিশ সুপার রেফাতুল ইসলাম বলেন, গত ২৭ জুন ভোরে তিনটি সিমে থাকা মোট ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৬৮ টাকা ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় করা মামলা তদন্ত করতে গিয়ে প্রথমে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্য ও তদন্তের ভিত্তিতে আরও সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

রেফাতুল ইসলাম বলেন, এখানে অপরাধের বিশেষ দিক হচ্ছে, গ্রাহকের শারীরিক উপস্থিতি ছাড়াই কৃত্তিমভাবে তৈরি তাঁর বায়োমেট্রিক পরিচয়কে (ছাপ) ব্যবহার করে তাঁর অজান্তেই সিম রিপ্লেস করা হয়। পরে সেই সিমে নিবন্ধিত এমএফএসে থাকা অর্থ সরিয়ে নেওয়া হতো। এতে গ্রাহকের কাছে কোনো ওটিপি নেওয়ারও বিষয় থাকে না। ফলে গ্রাহক বিষয়টি সহজে ধরতে পারতেন না।

এই চক্রে জড়িত অন্যান্য সদস্যদের গ্রেপ্তার ও অর্থ উদ্ধারের কার্যক্রম অব্যহত আছে জানিয়ে পুলিশ সুপার জামিরুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার আসামিদের আজ দুপুরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।