কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আপনার থানা আপনি চালান না। আপনার থানা চালায় হেলাল (দালাল)। কোনো দালাল নয়, আপনার থানা আপনাকে চালাতে হবে।’
কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় হাসনাত আবদুল্লাহ এ কথা বলেন।
আজ বুধবার দুপুরে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সম্মেলন কক্ষে ওই সভা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাকিবুল ইসলামের সভাপতিত্ব সভার প্রধান অতিথি ছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। সভায় তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যে বেতন ভাতা দেয়, তা নিয়েই চাকরি করতে হবে। ঘুষ–দুর্নীতি চলবে না। থানার পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো দালাল থাকতে পারবে না। কেউ নিয়মের বাইরে চলতে পারবে না।’
সভায় দেবীদ্বার থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামানসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
ওসিকে উদ্দেশ করে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আপনার সেকেন্ড অফিসার পুরোপুরি দুর্নীতিগ্রস্ত, টাকা ছাড়া তাঁর পা চলে না। আরেকজন আছে এসআই ভবতোষ, উনি টাকা ছাড়া একটা পা মুভ করেন না। মনে করেন আপনি ধরতে যাবেন—ধরতে যাওয়ার আগে থানা থেকে ফোন দিয়ে দিল—আমরা আসতেছি। তাহলে তো এখানে একটা চোর-পুলিশ খেলা হয়। আপনি আপনার অফিসারদের নিয়ে বসেন এবং না হয় এটার জন্য জনরোষের শিকার হবেন আপনারা। আমার কাছে প্রমাণ আছে, আমি প্রমাণ নিয়েই কথা বলছি। আমি বলতে চাই দেবীদ্বারে এ ধরনের কার্যক্রম কোনোভাবেই চলতে পারে না।’
হাসনাত ওসিকে আরও বলেন, ‘আপনার থানা আপনি চালান না। আপনার থানা চালায় হেলাল। আমি এখানে একটি কথাও না জেনে বলছি না। আপনাকে বলতে চাই—আজকের পর থেকে হেলাল আপনার থানায় ঢুকতে পারবে না। আজকে থেকে আপনার থানা আপনি চালাবেন। আইন অনুযায়ী আপনার থানা চলবে। ভুক্তভোগীদের হেলালের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ভেতরে যেতে হয়। কোন মামলা রুজু হবে, কোনটা হবে না—সেটাও তাঁর মৌখিক নির্দেশনা থাকে। নিরীহ মানুষ পুলিশের কাছে যাওয়ার আগে অচাকরিজীবী পুলিশদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়। এগুলো বন্ধ করতে হবে। এটা আপনার জায়গা থেকে দেখতে হবে।’
সভায় হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘জনগণ আমাদের বিনা পয়সায় ভোট দিয়েছে। নির্বাচনে আমি একটি পয়সাও খরচ করিনি। এই ইলেকশনে আমার নিজের ১০০ টাকাও খরচ হয়নি। তাই আমার দায়বদ্ধতা হচ্ছে দেবীদ্বারের মানুষের কাছে। আমি মানুষের জন্য কাজ করার একটা জায়গা চেয়েছিলাম। এখন আল্লাহপাক যেহেতু সে সুযোগ দিয়েছেন, অবশ্যই জনগণের পক্ষ হয়ে তাদের কল্যাণে কাজ করব। সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনগণ যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বলব, সরকার আপনাদের যে সুবিধা দেয়, সেগুলোর মধ্য দিয়েই জনগণকে সেবা দিতে হবে। এখানে অতিরিক্ত কোনো কিছু নেওয়া যাবে না। আপনাদের ঘুষের প্রচলন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
সভায় গোমতী নদীর মাটি লুটের প্রসঙ্গে হাসনাত বলেন, ‘মাটিখেকোরা মাটি কাটার আগে পুলিশকে জানায় “আমরা এই সময় থেকে ওই সময় পর্যন্ত মাটি কাটব।” ইউএনও ও এসিল্যান্ড স্পটে যেতে যেতে পুলিশ আবার তাদের সচেতন করে দেয়। তখন স্পটে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায় না। তাদের যদি এক লাখ দুই লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়, এটা তারা ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে ধরে নেয়। এই খরচটা তাদের গায়েই লাগে না। আমি বলব, সমঝোতার ভিত্তিতেই গোমতী নদী থেকে মাটি কাটা হচ্ছে। এতে থানা পুলিশের কিছু সদস্য জড়িত আছে। আমি গতকাল রাতে গোমতী নদীর বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখেছি। আমি যাওয়ার খবর তারা আগেই পেয়ে যায়। কাল কেউ মাটি কাটার সাহস করেনি।’
এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি, দেবীদ্বারে যে পাঁচটি স্পট থেকে মাটি কাটা হয়, ওই পাঁচটি স্পটের মধ্যে একটি স্পটেও যেন আর এক কোদাল মাটি কাটা না হয়। যদি এক কোদাল মাটি কাটা হয়, সে ক্ষেত্রে আপনারা আইনগত ব্যবস্থা নিবেন। না হলে আমি ধরে নেব, আপনারা প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলেই তারা মাটি কাটার সুযোগ পাচ্ছে। আমি মনে করি, পুলিশের ভূমিকা এখানে খুবই জরুরি।’
বুধবার বিকেলে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দেবীদ্বার থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মনে হয় এখানে কোনো ভুল–বোঝাবুঝি হচ্ছে। থানা অন্য কেউ চালানোর সুযোগ নেই। আমরা নিজের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি পেশাদারত্বের সঙ্গে মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য। আমরা দালালের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক আছি। এরপরও আজকে যেহেতু বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, এ নিয়ে আমরা আরও সতর্ক হবো। আমি থানাকে শতভাগ দালালমুক্ত করার চেষ্টা করব।’
থানার দুজন এসআই সম্পর্কে সংসদ সদস্যের বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘আমি আজকেই বিষয়টি শুনলাম এমপি সাহেবের কাছ থেকে। আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সেখানে অনেকে দেখলাম ফেসবুকে লাইভ করছে। আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা- লাইভ করতে আমার জীবনেও দেখিনি। যেহেতু এমপি সাহেব দুজন অফিসারের বিষয়ে কথা বলেছেন—বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব।’