সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড, ছেলের মরদেহ শুধু একবার দেখতে চান বাবা–মা

সৌদি আরবের জাতীয় পতাকাছবি: রয়টার্স

দীর্ঘদিন সৌদি আরবে থেকেও পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে পারেননি আবদুল বাছির। ২০২০ সালে দেশে ফিরে শুরু করেন কৃষিকাজ। সচ্ছলতার আশায় ছয় লাখ টাকা ঋণ করে ২০২২ সালের শেষ দিকে বড় ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠান। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আট মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন ছেলে। তখনো ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকা পরিশোধ বাকি।

ছেলে সৌদি আরবে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার প্রায় তিন বছর পর গত বুধবার (১৪ অক্টেবর) ভয়ংকর একটি খবর পান বাবা। জানতে পারেন ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। খবরটি শোনার পর থেকে তাঁর মনে হচ্ছে, বেঁচে থেকেও যেন তিনি বেঁচে নেই। এখন শুধু একটাই চাওয়া, সৌদি আরব থেকে ছেলের মরদেহ দেশে এনে তাঁকে যেন একটিবার দেখানো হয়।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড সম্প্রতি কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)। যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তারা হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বিষয়টি জানতে পেরেছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন কাজ করবে।

নজরুল ইসলামের (২৫) বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সদর উপজেলায়। এই উপজেলার একটি গ্রামের আবদুল বাছির ও রহিমা বেগমের বড় ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে নজরুল বড়। নজরুল ২০২০ সালে একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন। পরে সদর উপজেলার একটি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন।

নজরুলের বাবা দীর্ঘ ২৪ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। ২০২০ সালে দেশে চলে আসেন। দীর্ঘ দিন প্রবাসে থাকলেও পরিবারে সচ্ছলতা আনতে পারেননি। দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন। নজরুলের ছোট ভাই (১৪) স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় পড়ে। এক বোন (৯) পড়ে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে। ছোট বোনের বয়স চার বছর।

প্রথম সাত–আট মাসে ছেলে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। এরপর তিন বছর ধরে ছেলে সে দেশের জেলে। ছেলের এমন মৃত্যুর খবর শুনে বোনও হঠাৎ হৃদ্‌রোগে মারা গেল।
আবদুল বাছির, নজরুল ইসলামের বাবা

খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু

পরিবারের সদস্যরা জানান, নজরুল ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে যান। পবিত্র মক্কা নগরীর হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন তিনি। সৌদি আরবে যাওয়ার আট মাসের মাথায় সেখানকার পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এর পর থেকেই তিনি দেশটির কারাগারে ছিলেন। গ্রেপ্তারের এক মাস পর বিষয়টি জানতে পারে পরিবার।

মাঝেমধ্যে বাবা–মায়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন নজরুল। তাঁদের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয় ১১ অক্টোবর। সেদিন দুই থেকে আড়াই মিনিট কথা হয়। এরপর গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে একজন ফোন করে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি পরিবারকে জানান।

পরিবারের সদস্যরা জানান, নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর শুনে তাঁর ফুফু আবেদা বেগম (৬৫) মূর্ছা যান। সেদিন (গত বুধবার) রাত দুইটার দিকে মারা যান তিনি।

ছেলেই এক মাস পরপর ফোন করত। এক থেকে দুই মিনিট কথা বলত। আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযাগ আনা হইছে তা মিথ্যা। আমি শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চাই।
রহিমা বেগম, নজরুল ইসলামের মা

ষড়যন্ত্র দেখছে স্বজন–বন্ধুরা

নজরুলকে বিনয়ী ও ভদ্র বলেই জানেন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা। সৌদি আরবে নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যায় না বলেও দাবি তাঁদের। এ অভিযোগের পেছনে ষড়যন্ত্র ছিল বলে মনে করেন তাঁরা।

নজরুলের দূরসম্পর্কের দুই চাচাতো ভাই মোস্তাকিম ভূঁইয়া ও ইমাম হাসান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতার কাজ করার সময় নজরুলের সঙ্গে একজনের বিরোধ তৈরি হয়। বিষয়টি ফোনে চাচা–চাচিকেও (নজরুলের বাবা–মা) বলেছিলেন। ওই ব্যক্তি পাকিস্তানের নাগরিক, এমন কথা নজরুল জানিয়েছিলেন তাঁদের। ওই লোকের ষড়যন্ত্রের কারণেই নজরুলের এমন পরিণতি হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।

নজরুলের বন্ধু রাহাত ভূঁইয়া বলেন, সৌদি আরবে নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্টের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সে এ ধরনের কাজ করেছে বলে বিশ্বাস হচ্ছে না।

স্থানীয় যে দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছিলেন নজরুল, সেই মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা নাঈমুর রহমান বলেন, নজরুলের আচার-আচরণ ও চলাফেরা খুবই ভালো ছিল। কেউ তাঁর বিষয়ে এমন বলতে পারবে না যে ছেলেটা বাজে ছিল বা খারাপ ছিল। তাঁর সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে, দেশে থাকতে তাঁর চলাফেরায় কখনো এমন কিছু দেখিনি।

ছেলের মরদেহ দেখতে চান বাবা–মা

আজ সোমবার সকালে নজরুলদের বাড়িতে যান এই প্রতিবেদক। তাঁর বাবা আবদুল বাছিরের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন বারবার কাঁদছিলেন তিনি।

আবদুল বাছির প্রথম আলোকে বলেন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠান তিনি। প্রথম সাত–আট মাসে ছেলে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। এরপর তিন বছর ধরে ছেলে সে দেশের জেলে। ছেলের এমন মৃত্যুর খবর শুনে বোনও হঠাৎ হৃদ্‌রোগে মারা গেল। এখন শুধু ছেলের মরদেহ দেখার অপেক্ষায় আছেন তিনি।

ছেলে হারানোর শোকে গত কয়েক দিন টানা কাঁদছেন মা রহিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘ছেলেই এক মাস পরপর ফোন করত। এক থেকে দুই মিনিট কথা বলত। আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযাগ আনা হইছে তা মিথ্যা। আমি শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চাই।’