জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান ঠেকাতে রাস্তায় ট্রাক, ভাঙা হলো কালভার্ট

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে চলছে যৌথ বাহিনীর অভিযান। আজ সকালে তোলা
ছবি: জুয়েল শীল

কোথাও রাস্তার ওপর রাখা হয়েছে বড় ট্রাক। কোথাও আবার ভেঙে ফেলা হয়েছে কালভার্ট। নালার স্ল্যাবও তুলে ফেলা হয়েছে একটি স্থানে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযানে গিয়ে এসব প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের খবর আগেই পেয়েছেন জঙ্গল সলিমপুরে থাকা সন্ত্রাসীদের একটি অংশ। তাই অভিযানের আগে গতকাল রাতেই এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন সন্ত্রাসীরা।

জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপর পক্ষে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া এক র‍্যাব কর্মকর্তাকে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় রয়েছে তাঁর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজ অভিযানের আগে যেসব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে এর উদ্দেশ্য আলীনগরে যৌথ বাহিনীর প্রবেশ ঠেকানো। আলীনগরে প্রবেশের মূল রাস্তাতেই ট্রাকটি রাখা হয়। কালভার্টটিও আলীনগরের কাছে।

এটি অনেক বড় অভিযান। এখানে বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন আছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সিএনজি অটোরিকশার চালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সোর্স রয়েছে। কোনোভাবে হয়তো জেনে গেছে।
— নাজমুল হাসান, অতিরিক্ত ডিআইজি, চট্টগ্রাম রেঞ্জ।

জানতে চাইলে এসব প্রতিবন্ধকতার কথা স্বীকার করেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান। বেলা ১১টার দিকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ছিন্নমূল ও আলীনগর জঙ্গল সলিমপুরেরই অংশ। ছিন্নমূলের পরেই আলীনগর। ছিন্নমূল যাওয়ার পর আলীনগর ঢোকার আগে রাস্তায় একটি ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়। যত বাহিনী আছে, তারা এটি সরিয়ে সামনে এগোয়। কিছু দূর পরে, সম্ভবত রাতের আঁধারে, একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে। পরে কালভার্টের ওই অংশ ইট–বালি দিয়ে ভরাট করে যৌথ বাহিনীর গাড়ি আলীনগরে প্রবেশ করেছে।

অভিযান শুরুর আগে কীভাবে এসব ঘটল জানতে চাইলে নাজমুল হাসান বলেন, ‘এটি অনেক বড় অভিযান। এখানে বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন আছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সিএনজি অটোরিকশার চালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সোর্স রয়েছে। কোনোভাবে হয়তো জেনে গেছে।’

আরও পড়ুন
জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান ঠেকাতে রাস্তায় ট্রাক, ভাঙা হলো কালভার্ট

অস্ত্র ও আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, ‘আমাদের অভিযান চলমান। এটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কত অস্ত্র উদ্ধার, কিংবা গ্রেপ্তারের সংখ্যা বলা যাচ্ছে না। এখানে আমাদের যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প করার পরিকল্পনা রয়েছে। যাতে সামনে নির্বিঘ্নে অভিযান পরিচালনা করা যায়।’

সকাল ছয়টা থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে যৌথ বাহিনীর প্রায় ৪ হাজার সদস্য অংশগ্রহণ করছেন। অভিযানের অংশ হিসেবে, সকাল থেকে জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে বসানো হয় তল্লাশি চৌকি, যাতে অভিযান শুরুর পর কেউ পালিয়ে যেতে না পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে অভিযানে অংশ নেন। অভিযানের সময় সাংবাদিকদের জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

গত জানুয়ারি মাসে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন র‍্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করে র‍্যাব। এতে মোহাম্মদ ইয়াসিন ছাড়াও ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া আসামি করা হয় অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ জনকে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, র‌্যাব সদস্যরা আসামি ধরতে গেলে তাঁদের ওপর সন্ত্রাসী মোহাম্মদ ইয়াসিনের নির্দেশে রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানো হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় র‌্যাবের আটক করা এক আসামিকে। চার র‌্যাব সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে যান আসামিরা। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে। এ ঘটনার পর জঙ্গল সলিমপুরে সমন্বিত অভিযান চালানোর কথা বলা হয়। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তখন অভিযান চালানো হয়নি।

আরও পড়ুন
ভেঙে ফেলা হয়েছে নালার স্ল্যাব, রাস্তার ওপর রাখা হয়েছে ট্রাক। আজ সকালে তোলা
ছবি: এক পুলিশ কর্মকর্তার তোলা

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি। এর বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। সীতাকুণ্ড উপজেলায় হলেও নগরের কাছেই এই এলাকা। এলাকাটির পূর্ব দিকে রয়েছে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ বোস্তামী থানা।

জঙ্গল সলিমপুর দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা। চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনো পাহাড় কেটে চলছে প্লট-বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। এলাকাটিতে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসী। র‌্যাবের ওপর হামলার আগে জঙ্গল সলিমপুরে গত বছরের অক্টোবরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারধরের শিকার হন দুই সাংবাদিক।

পুলিশ ও জঙ্গল সলিমপুরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইয়াসিন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীতাকুণ্ডের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতা এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ইয়াসিন নিজেকেও বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী দাবি করে আসছেন। তবে র‍্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে আসলাম চৌধুরী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে তাঁর কোনো অনুসারী নেই। ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নন।