‘সমান অধিকারে ছেলে-মেয়ে উভয়ের লাভ’
নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে মন্তব্য করে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ বলেছেন, ‘আমাদের সমাজে মেয়েরা নানা বাধাবিঘ্ন পার হয়ে এগোচ্ছে। সমাজের মূল কাঠামোগত জায়গাগুলোতে আমাদের মেন্টাল কন্ডিশনের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। সমাজের একটা বড় গ্রুপ চায়ও না মেয়েরা এগিয়ে যাক এবং এটাকে প্লে করার চেষ্টা করে যে মেয়েদের সমান অধিকার হলে ছেলেদের ক্ষতি হবে।’
সোমবার সকালে ঢাকার সাভারে ব্র্যাক সিডিএম সেন্টারে কিশোর-কিশোরী উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সাবেক সদস্যদের (অ্যালামনাই) মিলনমেলায় এ কথা বলেন আসিফ সালেহ্। অনুষ্ঠানে উপস্থিত পুরুষদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এখানে যেসব ছেলে আছে, তারা জানে যে মেয়েদের অধিকার যদি ছেলেদের অধিকারের সমান হয়, তাহলে ছেলেদেরও অনেক লাভ। সমাজের অন্য ছেলেদের বুঝাতে হবে ছেলে ও মেয়ে উভয়েই যদি দায়িত্ব ও কাজ সমানভাবে ভাগ করে নেয়, তাহলে দুজনের জন্যই লাভ। আর এর মধ্য দিয়ে সুন্দর একটি পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটা সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘আমরা আটকে যাই—ওরে কী বলবে, মানুষ কী বলবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের সমাজ বলছে—তোমরা নিজেকে গুটিয়ে নাও, তোমাদের স্বপ্ন বন্ধ করে দাও, তোমাদের এত স্বপ্ন দেখার দরকার নেই। প্রত্যেকটা মানুষের যেহেতু সম্ভাবনা আছে, প্রত্যেকটা মানুষের সম্ভাবনা বাস্তবায়নের অধিকার আছে এবং প্রত্যেক মানুষেরই সুযোগটা পাওয়ার অধিকার আছে। সেই জায়গাতেই এডিপি ক্লাব একটা সহায়কের মতো কাজ করেছে।’
নারীর অধিকারের বিষয়ে আসিফ সালেহ্ বলেন, ‘আমরা অনেকটা সন্তুষ্টিতে ছিলাম এই ভেবে যে আমরা এগিয়ে গেছি। এ ছাড়া আমরা একটা ইকুয়াল সোসাইটি (সমান অধিকারের সমাজ) দেখতে চাই, কিন্তু আমরা গত দেড় বছরে দেখেছি কত কুইকলি (দ্রুত) আবার এটা ছিনতাই হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।’
ব্র্যাকের কর্মকর্তারা জানান, গ্রামীণ কিশোরীরা নানাভাবে পিছিয়ে থাকায় তাদের জন্য ১৯৯৩ সালে ব্র্যাক সিডিএম সেন্টারের কিশোর-কিশোরী উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) চালু করা হয়। এর মাধ্যমে কিশোর–কিশোরীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, পড়াশোনার সুযোগ এবং জীবন দক্ষতা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৯ পর্যন্ত এডিপি ক্লাবের কার্যক্রম চলমান ছিল। সদস্য ছিল ১০ লাখ। পরে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এটি সরকারিভাবে করার কথা জানায়। একই সঙ্গে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে পরের ধাপটা কী হবে, সেটি নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়। এরপর কোভিড শুরু হয়। কোভিডের পর কিশোরীদের নিয়ে ‘স্বপ্ন সারথি’ নামে একটি কর্মসূচি শুরু হয়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘আমরা নতুন নেটওয়ার্ক’ নামে একটি উদ্যোগ নেওয়া নেওয়া হয়।
কর্মকর্তারা জানান, এডিপি ক্লাব মূলত খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (ক্রিটিক্যাল প্ল্যাটফর্ম) দিয়েছিল। এখন স্পোর্টস অলিম্পিয়াড বা কালচারাল অলিম্পিয়াডের মতো উদ্যোগ নেওয়ার মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চায় ব্র্যাক। এই লক্ষ্যে এডিপির সাবেক সদস্যদের নিয়ে এই মিলনমেলার আয়োজন করা হয়েছে।
ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মাইগ্রেশন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান বলেন, স্পোর্টস অলিম্পিয়াড এবং কালচারাল অলিম্পিয়াডটা যেন দেশব্যাপী হয় এবং প্রতিবছর বড় একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে, যেখানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসবে এবং সেখানে তাঁদের মেধা, সৃজনশীলতা প্রকাশ পাবে।
তুমি নারী, তুমি বদ্ধ ঘরে আটকে থাকার জন্য না
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী অ্যালামনাইদের মধ্য থেকে কয়েকজন তাঁদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। ব্র্যাকের কিশোরী কেন্দ্রগুলো কীভাবে তাঁদের জীবন বদলে দিয়েছে, তা তুলে ধরেন।
এডিপির সাবেক সদস্য নৃত্যশিল্পী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া রহমান (মোহনা) বলেন, ‘আজকের এই মোহনা হয়ে ওঠাটা আসলে একদিনের জার্নি নয়। আমার শুরুটা অনেক কঠিন ছিল। মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর থানার প্রত্যন্ত একটি গ্রামে বড় হয়েছি পারিবারিক আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে ব্র্যাকের কিশোরী ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হই। মাটির উঠোনের ওপর থেকে এখন আজকে আমি প্ল্যাটফর্ম। ব্র্যাক আমাকে ওই অজপাড়াগাঁ একটা জায়গা থেকে তুলে নিয়ে এসেছে। ব্র্যাক আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। ব্র্যাক আমাকে বলেছে—ঘরের বাহির হও, সামনে আসো। তুমি নারী, তুমি বদ্ধ ঘরে আটকে থাকার জন্য না।’
ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের সফল ব্যবসায়ী ও বিউটিশিয়ান ফাহিমা আক্তার বলেন, ‘২০১১ সাল থেকে আমি ট্রেনিং পাওয়ার পরে বাসায় যাইয়া একটা পারলার দিছি। ওই সময় কেউ পারলার দিতে দিবে না, গ্রামের সব মানুষ বাধা দিছে আমার সঙ্গে অন্য মেয়েদের মিশতে দেয় নাই।’ তিনি বলেন, ‘পারলারের পাশাপাশি একটা কসমেটিকসের দোকান দিছি বিশাল বড় কইরা। এখানে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ওপরে আমি ইনভেস্ট করছি। ৩০ লক্ষ টাকা খরচ করে একটা জায়গা কিনছি।’