একজন কোপ দেয় কিরিচ দিয়ে, কয়েকজন করে গুলি, ঘটনাস্থলেই যুবদল কর্মীর মৃত্যু
মুহাম্মদ করিম বাজারে ঢুকতেই ৪-৫টি মোটরসাইকেল নিয়ে তাঁকে ঘিরে ফেলে একদল সন্ত্রাসী। তাদের একজন কিরিচ দিয়ে কোপ দেয় করিমের ঘাড় ও মাথায়। রক্তাক্ত অবস্থায় করিম মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই তাঁকে গুলি করে কয়েকজন। করিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মোটরসাইকেলে করেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে সন্ত্রাসীরা।
চট্টগ্রামের রাউজানে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে এভাবেই খুন করা হয় স্থানীয় যুবদল কর্মী মুহাম্মদ করিমকে। তাঁকে হত্যার এই বিবরণ প্রথম আলোকে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
মুহাম্মদ করিম চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরের কেরানীহাট বাজারে এভাবেই প্রকাশ্যে খুন করা হয় তাঁকে।
ঘটনার পর রাতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কেরানীহাট বাজারের সব দোকানপাট বন্ধ। আশপাশের এলাকায়ও থমথমে পরিস্থিতি। বাইরে তেমন লোকজন নেই। হত্যাকাণ্ডের পর সড়কের ওপর করিমের লাশ পড়েছিল প্রায় এক ঘণ্টা। পরে পুলিশ এসে লাশটি উদ্ধার করে।
মুঠোফোনে বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বিবরণ দেন। জানান, শত বছরের পুরোনো এই বাজারে এর আগে এভাবে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা তাঁরা দেখেননি। ঘটনার পর আতঙ্কে রয়েছেন বলেও জানান বাজারের ব্যবসায়ীরা।
সুরতহাল প্রতিবেদনের সূত্রে পুলিশ জানায়, করিমের শরীরের তিনটি স্থানে গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা। করিমের পেটে, ঊরুতে ও নিতম্বে গুলি লেগেছে। একটি গুলি কোমরের পাশ দিয়ে ঢুকে পেট দিয়ে বের হয়ে গেছে। এর বাইরে ঘাড় ও কপালে কোপানো হয়েছে তাঁকে। ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ছিল না বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
দুই বছর আগে দেশে ফেরেন করিম
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করিম দীর্ঘদিন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারপ্রবাসী ছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর তিনি দেশে ফেরেন। বিএনপির বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে সক্রিয় ছিলেন তিনি। এলাকায় যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিতি থাকলেও তাঁর কোনো পদপদবি ছিল না। তাঁর পদ না থাকার বিষয়টি রাউজান উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আজম প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন।
করিমকে হত্যার ঘটনার পর রাত ১০টার দিকে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের কেউ ঘরে নেই। তাঁর বড় ভাইয়ের ঘরের সামনে ১০–১২ জন প্রতিবেশী বসে রয়েছেন। তাঁরা করিমকে হত্যার ঘটনা নিয়ে আলাপ করছেন।
বাসিন্দারা জানান, একসময় দেশে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন করিম। পরে বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় প্রবাসী হন। দুই বছর ধরে এলাকায় ফিরে এসে মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে যুক্ত হন তিনি। পরিবার নিয়ে থাকতেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের আমান বাজারে। মাঝেমধ্যে দিনে নিজ এলাকায় ঘোরাফেরা করলেও রাতে আমানবাজারের বাসায় ফিরে যেতেন। পরিবারে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে তাঁর।
যা বলছে পুলিশ
পুলিশ জানায়, করিম অন্তত ১০টি মামলার আসামি। চুরি, মাদক, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে এসব মামলা করা হয়েছে। তিনি জেলও খেটেছেন একাধিকবার।
রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মুহাম্মদ বেলায়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব থেকে এ খুনের ঘটনা ঘটতে পারে। খুনের ঘটনার পর বাজারটি লোকশূন্য হয়ে পড়ায় কীভাবে, কেন এই খুনের ঘটনা ঘটল—পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সে বিষয়ে কিছু জানতে পারেনি। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পুলিশ কর্মকর্তা বেলায়াত হোসেন আরও বলেন, করিমের শরীরে তিন জায়গায় গুলি করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেছে অস্ত্রধারীরা।
এর আগে ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী বাজারের চৌমুহনী এলাকায় একদল অস্ত্রধারী গুলি করে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে (৪৮) হত্যা করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টি হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সাড়ে তিন শর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।